সেই শিশুকে কোলে নিয়ে কান্না থামালেন বিচারপতি

স্টাফ রিপোর্টার : কোর্ট-কাচারি কী তা না বুঝলেও মা-খালার দ্বন্দ্বে আদালতে আসতে হয়েছে টাঙ্গাইলের দেড় বছরের শিশু অংশুমানকে। শিশুর খালা শুভা রানী গুহ, মা জবা দে, বাবা বিপুল দে’সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা আদালতে উপস্থিত হন। এ ছাড়া আইনজীবী ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে এজলাস কক্ষ ছিল পরিপূর্ণ। আদালত একে একে সব পক্ষের বক্তব্য শুনতে থাকেন। এ সময় শিশুটির মায়ের কান্নায় এজলাস কক্ষে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আদালত শিশুটিকে খালার হেফাজতে দেওয়ার পর মা কোলে নিতে চান। তখন মা শিশুটিকে কোলে নেন। এ সময় শিশু অংশুমান কিছুটা ভয় পেয়ে যায় এবং কান্না শুরু করে। তখন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নাইমা হায়দার নিজ আসনে বসেই শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদর করেন। এ সময় বিচারপতি নাইমা হায়দার শিশুর কান্নার থামানোর জন্য চকলেট দেন। কিছুক্ষণ শিশুটিকে বিচারপতি তার কাছে রেখে পরে আবার তার খালার কাছে ফেরত দেন।

আদালত এ মামলার সমাপ্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে খালা শিশু অংশুমানকে নিয়ে দ্রুত কোর্ট থেকে বের হয়ে চলে যান। তবে বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্টও শিশু অংশুমানকে আপতত তার খালার হেফাজতেই রাখতে বলেছেন। তবে শিশুর মাকে দেখাশুনার সুযোগ দিতে বলেছেন আদালত। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তলব করা টাঙ্গাইল-ক অঞ্চলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সতর্ক করে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদলত। শিশু অংশুমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খালার হেফাজতে দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তার মায়ের করা আবেদন নিষ্পত্তি করে এই আদেশ দেওয়া হয়। উপযুক্ত আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শ.ম রেজাউল করিম। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী শামীমা ইসলাম মৌ। খালার পক্ষে আইনজীবী সুব্রত সাহা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে আইনজীবী অজি উল্লাহ আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

পরে আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী এখন শিশু অংশুমান আপাতত খালার হেফাজতে থাকবে। মা মাঝে মাঝে তার সন্তানকে দেখাশুনার সুযোগ পাবে। মামলাটি এখন উপযুক্ত এখতিয়ার সম্পন্ন দেওয়ানি আদালতে যাবে। দেওয়ানি আদালত সাক্ষ্য গ্রহণের ভিত্তিতে দত্তক বিষয়ে এই মামলায় রায় দেবেন। এই বলে আবেদনটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। শিশুকে খালার হেফাজতে দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন শিশুর মা। সেই আবেদেনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ এপ্রিল ১৮ মাসের শিশু অংশুমানকে খালার হেফাজতে দেওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে তলব করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খালার হেফাজতে থাকা শিশু অংশুমান, তার খালা শোভা রানী গুহ ও স্বামী বিপ্লবগুহকে আদালতে হাজির করতে ঘাটাইল থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।  এর আগে হাইকোর্টে করা মায়ের আবেদনে বলা হয়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার চান্দশী গ্রামের বাসিন্দা বিপুল দে ও জবা রানী দে। তাদের এক বছর বয়সের সন্তান অংশুমানকে ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর শিশুটির খালা ও খালু দুই/তিন দিনের জন্য নিয়ে যায়। এরপর ওই শিশুর বাবা-মা তাদের সন্তান ফেরত চাইলে সন্তান না দিয়ে তাদের বাড়িতে আটকে রাখে। এ অবস্থায় নিজ সন্তানকে ফেরত পেতে গত ১৬ জানুয়ারি টাঙ্গাইল ক-অঞ্চলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেন শিশুটির বাবা-মা। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঘাটাইল থানার ওসিকে শিশুটিসহ খালাকে হাজির করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ১৮ জানুয়ারি শিশুটিকে হাজির করা হলে তাকে তার মায়ের কাছে ফেরত দেন আদালত। এরপর আবার ২১ মার্চ উভয়পক্ষের শুনানি শেষে শিশিুটিকে তার খালার হেফাজতে দেওয়ার আদেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।