ফিকে হয়ে যাওয়া আশা নিয়েই নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছে রোহিঙ্গারা

ফুলকি ডেস্ক : মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধেয়ে আসা বন্দুকের ভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিলেন নবী হোসাইন নামের এক রোহিঙ্গা তরুণ। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মা-হারানো ওই ব্যক্তির সঙ্গে ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে পালিয়ে আসছিলো তার বোনটিও। শৈশবেই মা হারানো নবীকে এই বোনটিই মাতৃস্নেহে বড় করে তুলেছে। সেই বোনকে ধান ক্ষেতের মধ্যেই হারিয়ে ফেলেন নবী। বাধ্য হয়ে একাই আশ্রয় নেন শিবিরে। সেই সেপ্টেম্বর থেকে পেরিয়ে গেছে ৬টি মাস। এখনও শিবিরের লাখ লাখ রোহিঙ্গার মুখে নিখোঁজ হওয়া নিজ বোনের ছায়া খুঁজে ফিরছে নবী। কেবল নবী নয়, নবীর মতোই হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মরিয়া। তবে মিয়ানমার নিখোঁজদের খোঁজ পেতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো বিভিন্ন গ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত নিশ্চিহ্ন করতে সেখানে বুলডোজার চালিয়েছে। তারা বলছে, প্রত্যাবাসনের আগে নিহত ও নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা নিরুপণ করা সম্ভব না। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী অন্তত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তত ৪৩ হাজার শিশু তার বাব-মা’র কোনও একজনকে হারিয়েছে। এছাড়া কেউ ভাই হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন বোন, কেউ স্বামী কিংবা স্ত্রীকে। মিয়ানমারের অসহযোগিতা আর অনিচ্ছায় তাদের ফিরে পাওয়ার আশা ফিকে হয়ে আসলেও স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা জিইয়ে রেখেছে রোহিঙ্গারা।    গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। তাদের আর সবার মতোই কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা হয়েছেন নবী হোসাইন। বাংলাদেশে আসার পর থেকেই খুঁজে ফিরছেন বড় বোনকে। মুখে দাঁড়িসম্বলিত এই কৃষকের ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর সঙ্গে বোনের সম্পর্ক অন্যরকম হয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে তার বোনই তাকে লালন-পালন করেছেন। তার বাবা যখন মাঠে কাজ করতে যেতেন তখন বোনই তার দেখাশোনা করেছেন। নবী হোসাইন বলেন, তিনি তাকে সকালে গোসল করাতেন ও মাথার চুল ঠিক করে দিতেন। রোজার মাসে সারাদিন পর সন্ধ্যায় তাকে গুড়ের পিঠা তৈরি করে দিতেন। নবী বলেন, ‘তিনি আমাকে একই সঙ্গে বোন ও মায়ের ভালবাসা দিয়েছেন’।

পালিয়ে আসবার সময় ধানক্ষেতের ভীড়ে হারিয়ে ফেলা বোনকে আজও খুঁজে ফিরছে নবী। বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখেছেন আশা। হয়তো তার বোনও নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে। নবীর বোনের নাম সামারুক। তার কোনও ছবি বা অন্যকোনও পরিচয় নেই। শুধু বর্ণণা দিতে পারেন নবী। তার ভাষায়, তিনি বয়স্ক কিন্তু এখনও সবল ও সবসময় হাসিখুশি থাকতেন। তিনি বলেন, ‘সে হয়তো বাংলাদেশে আছেন কিন্তু আমি এখনো তাকে খুঁজে পাইনি’। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ পালিয়ে আসাদের মধ্যে হাজারো মানুষ এখনও নবী হোসাইনের মতো নিজের প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছেন। আসিয়ানের মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় প্রতিনিধি দলের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা ৪৩ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু তাদের বাবা-মায়ের অনন্ত একজনকে হারিয়েছে। অন্যরা সন্তান, সহদোর ও আত্মীয় স্বজনদের হারিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পালিয়ে আসা বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হলেও তা কার্যকরের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। কেবল গত বছর আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত কেবল ৩৮৮ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। এই অবস্থাতেই গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালিয়ে আলামত নষ্ট, বিপুল সামরিকায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকা, প্রত্যাবাসন নিয়ে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর হুমকির ধারাবাহিকতায় রাখাইনে বৌদ্ধদের মডেল গ্রাম গড়ে উঠছে বলে খবর পাওয়া যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সেনা অভিযানে নিহতদের সংখ্যা গণনায় সহায়তার পরিবর্তে মিয়ানমার গণহত্যার আলামত ধ্বংস করার জন্য রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্যাটেলাইট থেকে তোলা কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। এসব ছবিতে দেখা গেছে রোহিঙ্গা ভাষায় ‘অপার ফেয়ার’ নামে পরিচিত নবী হোসাইনের গ্রাম পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার সরকার বলছে, অপরাধের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারা গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালায়নি। বরং সেখানে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এই কাজ করেছে।  মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলে অভিহিত করে থাকে ও তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে আসছে। তবে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর এসব মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমারের অভিযানে গণহত্যার আলামত পাওয়া গেছে। আর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী বলছে, তারা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দমন করতে এই অভিযান চালাচ্ছে। বার্মা ক্যাম্পেইন যুক্তরাজ্য নামে আন্দোলনকারী সংগঠনের পরিচালক মার্ক ফারমানার বলেন, বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে একত্রিত করতে মিয়ানমার আসলে কিছুই করেনি। এটা সরকারের সম্পূর্ণ নিষ্ঠুর দৃষ্টিভঙ্গি। আর মিয়ানমারের শীর্ষ বেসামরিক নেতা অং সান সু চি’র মুখপাত্র জো হতাই বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা না ফেরা পর্যন্ত নিহত বা নিখোঁজের সংখ্যা গণনা করা সম্ভব নয়। কারণ শুধু তারাই জানে তাদের মধ্যকার কাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির প্রতিনিধি মেলিসা দুমিগনার্দ বলেন, তাদের সংগঠন বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে এক করতে কাজ করছে। কিন্তু কোনও সরকারি তালিকা না থাকায় কাজটি দ্রুত করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে থাকা শরণার্থীরাও তাদের পরিচিত মানুষকে খোঁজার জন্য মুখে মুখে প্রচার চালাচ্ছেন। তারা এজন্য বিভিন্ন বুথ স্থাপন করেছেন যেখানে মায়েরা তাদের সন্তানদের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে নির্মিত অস্থায়ী মসজিদগুলো এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিমাল হোসাইন নামে একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এ রকম একটি বুথ স্থাপন করেছেন। তিনি কয়েকশ পরিবারকে একত্র হতে সহায়তা করেছেন। যতগুলো পরিবারের তথ্য পেয়েছেন তাদের মধ্যে অর্ধেক কাজে তিনি সফল হয়েছেন। তারপরও গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ওই বুথ বন্ধ করে দেন। কারণ তখন আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এখনও নিখোঁজদের সম্পর্কে কিমাল বলেন, ‘কয়েক মাস হয়ে গেছে, আমার মনে হয় তারা আর জীবিত নেই’।

কিমালের আত্মীয় নবী হোস্ইান এখনও হাল ছাড়তে রাজি নন। তিনি বলেন, গত সেপ্টেম্বরে যখন তাদের গ্রামে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী সেখানে গিয়ে বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে তার বোন সামারুকের একমাত্র মেয়েটিও ছিল। স্ত্রী-সন্তান ও বোন সামরুককে নিয়ে অন্যান্য গ্রামবাসীর সঙ্গে নবী হোসাইনও সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তারা বাংলাদেশ সীমান্তের নাফ নদীর কাছাকাছি আসলে তারা আবারও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হামলার মুখে পড়ে। নবী ও তার ছেলে জানান, সে সময় দ্রুত পালানোর সময় বৃদ্ধ লোকজন পেছনে পড়ে যায়। হামলা বন্ধ হলে কয়েক ঘণ্টা পর নবীর ছেলে সেখানে গিয়ে তার খোঁজ করেন। কিন্তু সামারুক ও তার স্বামীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সেখানে তাদের হারানোর পর পরিবারের সদস্যরা চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তারা আশা করেন, সামারুক ও তার স্বামী হয়তো বাংলাদেশে চলে এসেছেন।

নবী বলেন, ‘এটাই আমার অপরাধ। সেনা সদস্যদের দেখার পর লোকজন শুধু নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্যই দৌড়ে পালিয়েছে’। তিনি জানান, শরণার্থী শিবিরে তাদের খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন। এটা জানার পরও স্ত্রীর কানের গয়না সাড়ে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করে তিনি বোনকে খুঁজেছেন। সম্প্রতি কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে একটি হলুদ ত্রিপলের নিচে কিছু বৃদ্ধকে বিশ্রাম করতে দেখেন তিনি। সেখানে গিয়েও তিনি তার বোন ও তার স্বামীর খোঁজ করেছেন। অপার ফেয়ার গ্রামের কাউকে দেখেছেন কিনা তাও জানতে চেয়েছেন হোসাইন। সে সময় সেখানে থাকা একজন জানান, তিনি এর আগেও নবীকে  বিভিন্ন প্রশ্ন করতে দেখেছেন। লোকটি জানান, আমরা সবাই কাউকে না কাউকে হারিয়েছি। সূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।