মাছের ফেলে দেওয়া অংশ রফতানি করে শত কোটি টাকা আয়

বিশ্বাস করতে কঠিন হলেও এটা সত্যি যে মাছের ফেলে দেওয়া অংশ রফতানি করে বিদেশ থেকে শত কোটি টাকা আয় করছে বাংলাদেশ। চিংড়ি মাছের মাথা ও খোসা, কার্প জাতীয় মাছের আঁশ, হাঙরের লেজ-ডানা-চামড়া, কাঁকড়ার খোলস, মাছের বায়ু থলি (ফুলকা), পিত্ত ও মাছের চর্বিসহ বিভিন্ন অংশ রফতানি করা হচ্ছে বিদেশে। ইউরোপসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এসব অপ্রচলিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থলবন্দর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।  জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে মাছের যে ফেলে দেওয়া অংশগুলো রফতানি করা হয়, তা দিয়ে স্যুপ তৈরি হয় এবং পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই স্যুপের চাহিদা ব্যাপক। রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, চিংড়ির মাথা ও খোসা, কাঁকড়ার খোলস, হাঙরের লেজ-ডানা-চামড়া, মাছের বায়ু থলি, পিত্ত ও চর্বি, কার্প জাতীয় মাছের আঁশসহ বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশ থেকে রফতানি হচ্ছে। ইতালি, জাপান, কোরিয়া, চীন, জার্মানি, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য রফতানি হচ্ছে।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব অপ্রচলিত পণ্য সংগ্রহের জন্য একটি গ্রুপ রাজধানী ও সমুদ্র তীরবর্তী জেলায় কাজ করে। এর মধ্যে রাজধানীর শ্যামবাজার, কাওরানবাজার ও হাতিরপুল বাজার থেকে মাছের এসব অংশ সংগ্রহ করেন তারা। যেহেতু কাটা মাছের এসব অংশ স্বাভাবিকভাবেই ফেলে দেওয়া হয়, সেহেতু এগুলো সংগ্রহ করা যায় খুবই অল্প দামে। বাড়তি মুনাফার আশায় রাজধানীর মাছের বাজারগুলোয় যারা মাছ কাটার কাজ করেন, তারাই মাছের ফেলে দেওয়া অংশ সংগ্রহ করেন। দিন শেষে এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীরা এগুলো নগদ টাকায় কিনে নেন। এছাড়াও রাজধানীর ফাইভস্টার হোটেলসহ বড় বড় হোটেলগুলোতেও অনেক মাছ কাটা হয়। সেখান থেকেও মাছের ফেলে দেওয়া অংশগুলো সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা।  মাছের ফেলে দেওয়া অংশের বাজার সম্পর্কে জানা যায়, খুবই অল্প দামে বেশি পণ্য কেনা যায়। তা আবার বেশি দামে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।  রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল থেকে মাছের ফেলে দেওয়া অংশ কেনেন আফজাল হোসেন নামের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এ ব্যাপারে তিনি  জানান, আগে হোটেল থেকে এগুলো ফ্রি পেতাম। এখন আর হোটেলের কর্মচারীরা ফ্রি দেন না। তারা যখন বুঝতে পেরেছেন যে-আমরা এগুলো নিয়ে বিক্রি করি, তখন থেকে তারা আর এগুলো আমাদের ফ্রি দেন না। এগুলোর বিনিময়ে টাকা চান।  আফজাল হোসেন আরও জানান, প্রথম দিকে ঠিকা কিনতাম। চাহিদা বেশি বলে এখন আর তারা ঠিকা দেন না। কেজি দরে দেন। মাছের ফেলে দেওয়া সব অংশই একত্রে কেজি দরে কিনে আনি। পরবর্তীতে তা বাছাই করে প্রয়োজনীয় অংশগুলো রেখে বাকি অংশ ফেলে দেই এবং যারা এগুলো দেশের বাইরে রফতানি করেন তাদের কাছে দিয়ে দেই।  জানা গেছে, রাজধানীর দু’টি স্থানে মাছের ফেলে দেওয়া অংশগুলো কেনার জন্য আড়ত রয়েছে। এর একটি যাত্রাবাড়ী এবং অপরটি শ্যামবাজার। যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজার আড়ত থেকেই এগুলোর বেশিরভাগই কর্কশিটের প্যাকেট করে স্থলবন্দর দিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। অপ্রচলিত পণ্য বলে এগুলো বিমানে পরিবহন করা কিছুটা অসম্ভব। তবে অনেকেই বিভিন্ন প্রকার মাছের প্যাকেটে করেও এগুলো রফতানি করছেন। তবে এর সংখ্যা খুবই কম।     রাজধানীর বাইরেও মাছের ফেলে দেওয়া অংশগুলো কিনতে পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পটুয়াখালী, খেপুপাড়া, কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন বাজারের আড়ত থেকে মাছের ফেলে দেওয়া এসব অংশ সংগ্রহ করা হয়। এসব অঞ্চলে হাঙ্গর ও হাঙ্গরের লেজ পাওয়া যায়। বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চিংড়ি মাছের মাথা, কাঁকড়ার খোলস এবং চিংড়ি মাছের খোসা সংগ্রহ করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।      এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এসব অপ্রচলিত পণ্য। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় এখনও এসব পণ্যের নাম নাই। তারপরও রফতানি হচ্ছে। যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।  বাংলাদেশ স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন চিংড়ির খোসা ও মাথা এবং প্রায় ৫০ টন কাঁকড়ার খোলস চীন ও ভিয়েতনামে রফতানি হয়। এছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কোরাল, লাক্কা, ঘোড়া মাছ, আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন মাছের বায়ু থলি, পিত্ত, চর্বি রফতানি করা হচ্ছে।  কাস্টমস সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি মাসে দেড়শ’ টন মাছের ফোৎনা রফতানি করে আয় করা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ লাখ ডলার। ইতালি, জার্মানি, কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামে প্রায় ২০০ থেকে আড়াইশ’ টন মাছের আঁশ রফতানি হচ্ছে। প্রতিমাসে গড়ে ৮টি কন্টেইনারে প্রায় ৮০ টন হাঙ্গরজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ ডলার।  এ ব্যাপারে রফতানিকারক মনোয়ার হোসেন  বলেন, ‘দেশের বাইরে মাছের ফেলে দেওয়া অংশগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই এগুলো সংগ্রহ করে রফতানি করছি। অপ্রচলিত পণ্য বলে তেমন কোনও সহায়তা পাই না। যে দামে কিনি তার চেয়ে কিছু বেশি মুনাফা নিয়ে বিক্রি করি। আমরা ছোট ব্যবসায়ী। পুঁজি কম। তাই নিজেরাই মাঠেঘাটে ঘোরাঘুরি করে পণ্যগুলো সংগ্রহ করে তা রফতানি করছি।’  তিনি আরও বলেন, ‘মাছ কাটা-ছেড়ার পর ফেলে দেওয়া অংশ থেকে পচা গন্ধ আসে বলে অনেকেই এগুলো পরিবহন করতে চায় না। কিন্তু এ অভিযোগ সঠিক নয়। এগুলো ফেলে দেওয়া অংশ হলেও আমরা এগুলোকে প্রসেস করে পরিষ্কার করে কর্কশিটে প্যাকেট করেই রফতানি করি।’  অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাইরের দেশগুলো থেকেই চাহিদা আসে। সেই চাহিদা অনুযায়ীই এগুলো সরবরাহ করা হয়।   এ প্রসঙ্গে জনতে চাইলে বণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব  জানিয়েছেন, ‘ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য বাড়ছে। আগামীতে এসব পণ্য রফতানি উৎসাহিত করতে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।’