বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ও ফিজিওথেরাপি

ওমর ফারুক : ভালো স্বাস্থ্যই সুস্থ ও সতেজ জীবনের চাবিকাঠি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৫০ সাল থেকে ৭ই এপ্রিল কে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে, সবার জন্য স্বাস্থ্য এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে ৬৯তম বারের মতো পালিত হবে ১৫০টিরও বেশী দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে রোগী তার রোগ অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসক এর কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন।
কথা হয় উত্তরার ভিশন ফিজিওথেরাপী সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়া উত্তরার মোসলেহ উদ্দিনের (৬৫) সাথে। তিনি জানান, স্ট্রোক করার পরপরই চিকিৎসা নিতে গেলেন সরকারী হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে জানালেন তাকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে। কিন্তু সরকারী হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক না থাকায় তাকে চিকিৎসা নিতে হলো বেশী টাকা খরচ করে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠা ফিজিওথেরাপি সেন্টারে। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন তার পরিবার ফিরে পাই নতুন প্রাণ।
গণ স্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপী বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ধামরাই এর অসহায় ইউসুফ আলী (৩৮) জানান, কোমর ব্যথার কারণে কোন কাজ করতে পারছিলেন না। তার কোমরে প্রচন্ড ব্যথা। ব্যথার কারণে চলা ফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে তার। তাকে নেওয়া হয় সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু চিকিৎসক জানান, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে তাকে। তাহলে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু সরকারী হাসপাতালে নেই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক। অসহায় ইউসুফ আলীর পরিবার আরো অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের যেতে হবে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠা ফিজিওথেরাপি সেন্টারে। কিন্তু ইউসুফ আলী চিন্তা করে এ নাকি চিকিৎসা বন্ধ হলো তার! পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে তাকে সারা জীবন! তারপর সমাজের বৃত্তবান ও গণ স্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের দরিদ্র চিকিৎসা সেবার আওতায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। অসহায় পরিবারটিতে ফিরে আসে সুখের ছায়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফিজিওথেরাপীস্টদের স্বাধীনভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের প্রজ্ঞাপন দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেল্থ ওয়ার্কার এর তালিকায় আইএসসিও কোড ২২৬৪ এ বলা হয়েছে ফিজিওথেরাপীস্টগণ মানুষের মোটর ফাংশনের উন্নয়ন। সর্বোচ্চ জয়েন্ট মোভমেন্ট ক্ষমতা প্রদান, ব্যথা নিরাময়, ইন্ঞ্জুরী চিকিৎসাসহ নন কমিউনিকেবল ডিজিজ চিকিৎসায় কাজ করবে।
গণ স্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি স্পেশালিস্ট ডাঃ রূপক চন্দ্র রায় (পিটি) বলেন “সরকার এসডিজি বাস্তবায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখলেও চিকিৎসা সেক্টরে এসডিজি বাস্তবায়নে মাল্টিডিসপ্লিনারী টিম কার্যকর হয়নি। প্রতিবন্ধীদের সঠিক চিকিৎসা থেকে বাদ রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন অসম্ভব, এসডিজি বাস্তবায়নে জেলা, উপজেলা হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি সেন্টার স্থাপন করা জরুরি”।

এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নন কমিউনেকেবল ডিজিজের (বাত-ব্যথা, প্যারালাইজড, জি.বি.এস, স্ট্রোক, সেরিব্রাল পালসি, স্পাইনালকর্ড ইন্ঞ্জুরী ইত্যাদির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই সকল নন কমিউনিকেবল ডিজিজ এর অধিংকাশ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা, যেমন জি.বি.এস. এর চিকিৎসায় মাল্টিডিসিপ্লিনারী টিম একসাথে কাজ করতে হয়। এই টিমে থাকেন নিউরোলজিস্ট, জেনারেল ফিজিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, রোগীর অভিভাবক। প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের পর রোগীর স্নায়ুর প্রদাহ বন্ধ করার জন্য এবং পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ও ভাইরাল ইনফেকশন বন্ধ করার জন্য ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু রােগীর মাংশপেশীর শক্তি বৃদ্ধি করে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য ঔষধ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুত ফিজিওথেরাপী চিকিৎসা। সময়মত সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় এই রােগ সম্পূর্ণরুপে নির্মূল করা যায়।
বাংলাদেশ এমডিজি বাস্তবায়নে সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু এসডিজি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি। এই এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করলেও মাল্টিডিসিপ্লিনারী টিম এখনো কার্যকর হয়নি।
যদি মাল্টিডিসিপ্লিনারী টিমের মাধ্যমে দ্রুত সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি চালু না করা হয় তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব বয়সের সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন নিশ্চিত করনে ২০৩০ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্থাৎ সবার জন্য স্বাস্থ্য এবং এসডিজি বাস্তবায়নে সমস্যায় পড়তে হবে বলে মনে করেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডাঃ সুলতানা ফারহাত জাহান রুনু (পিটি)।

উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসডিজি বাস্তবায়নে সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি চালু আছে। যেখানে কাজ করেন জেনারেল ফিজিশিয়ান, নিউরোলজিস্ট, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ডেন্টিস্ট, সমাজ কর্মী। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মতে প্রতি ২০জন নাগরিক এর জন্য একজন ফিজিওথেরাপীস্ট প্রয়োজন। কিন্তু ১৬ কোটি নাগরিকের বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্ট আছে মাত্র ২০০০, প্রতি লাখের জন্য একজন গ্রাজুয়েট ফিজিওথেরাপীস্ট নেই।