সিংগাইরে সাধক পিয়ারা পাগলার মাজার উচ্ছেদ করে সরকারি জমি দখল

মাসুম বাদশাহ্, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে : বোমা কিংবা গুলাগুলি করে নয় আশ-পাশের লোকজনকে ফিল্মি স্টাইলে জিম্মি করে রাতের অন্ধকারে পিয়ার পাগলা নামের এক অ্যাত্মিক সাধকের মাজার গুড়িয়ে দিয়েছে চিহ্নিত ভূমিদস্যু চত্রু। ঘটনাটি ঘটেছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নের পাছপাড়া গ্রামে। ২৫ বছর আগের মাজার উচ্ছেদ করে সরকারি খাস জমি দখল করায় অনুসারী ও এলাকাবাসির মধ্যে বইছে শোকের মাতম।

এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত দখলদার দেওয়ান জহিরুল ইসলাম খোকন (৩৮) প্রশাসনসহ সরকারদলীয় স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধিকে দিয়েছেন মোটা অংকের টাকা। ঘটনাকে পুঁজি করে হুমকি দিয়ে জনৈক সাবেক চেয়ারম্যান খোকনের কাছ থেকে বাগিয়ে নিয়েছেন টিভিএস মোটর সাইকেল। এ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্থানীয় বায়রা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান জিন্নাহ লাঠ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জড়িত শাস্তি দাবী করেছেন।

গত বুধবার সরেজমিনে জানা গেছে, জেলার হরিরামপুর উপজেলার বহুতলি গ্রামের মোঃ আবুল হোসেন ওরফে পিয়ারা পাগলা নামের আধ্যাত্মিক সাধক  স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়ন এলাকায় আসা-যাওয়া করতো। ওই এলাকাতে বেশ কিছুলোক পিয়ারা পাগলার ভক্ত হয়ে পড়ে। ভক্ত ছাড়াও এলাকার মানুষের কাছে সে ছিল বেশ জনপ্রিয়। পিয়ারা পাগলা ১৯৯২ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জ শহরের হানিফ নামের এক ভক্তের বাড়িতে মারা যান। তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী উপজেলার গাড়াদিয়া-বায়রা সড়কের পাছপাড়া গ্রামের আরেক ভক্ত জহুরা বেগমের বাড়ি সংলগ্ন সরকারি খাস জমিতে তাকে দাফন করা হয়। সে থেকে ওই এলাকায় পিয়ারা পাগলার ভক্তরা কবরটিকে মাজারে রুপান্তর করে। মাজারকে ঘিরে প্রতি বছর কার্ত্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহে ২ দিন ব্যাপি ওরশ উদযাপিত হয়। দিনে দিনে ওই ওরশ জমজমাট হয়ে উঠে। সময়ের আবর্তে পিয়ারা পাগলার মাজার সরকারি খাস জমিতে ভক্ত জহুরার পুত্র খোকন দখলে নিয়ে বাউন্ডারী দেয়াল নির্মাণ করে। এক পর্যায়ে পিয়ারা পাগলার ভক্তদের কাঁদিয়ে ওরশ বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় ৭ বছর বন্ধ থাকার পর ভক্তবৃন্দ ও স্থানীয়দের উদ্যোগে পুনরায় ওরশ উদযাপন শুরু হয়। খাদেম হিসেবে জহুরার ভাই ফেরদৌস মাষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি ফেরদৌস মাস্টারের মৃত্যুর পর জহুরার পুত্র খোকন মাজারটি সরিয়ে ফেলার নীল নকশা আঁটে। সে অনযায়ী পিয়ারা পাগলার স্ত্রী ও ২ মেয়েকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে ম্যানেজ করে এফিডেফিটের মাধ্যমে মাজারটি সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। এর অংশ হিসেবে গত ১৩ মার্চ ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে রাতের অন্ধকাওে ফিল্মি স্টাইলে মাজারটি গুড়িয়ে দেয়। পিয়ার পাগলার পরিবারের হাতে ধরিয়ে দেয় মাজারস্থলের দু‘কোদাল মাটি। মাজারটি ধ্বংশ করে খোকন তার দখলে নেয় মাজারের জায়গায়সহ সমস্ত খাস জমি।

স্থানীয়দের দেয়া তথ্যানুযায়ী, মাজারের পাশে ৩৫ ফুট সরকারি রাস্তার প্রায় অর্ধেক দখল করেছেন খোকন। এছাড়া তাদের বাড়ি সংলগ্ন দক্ষিণ পূর্ব পাশের বায়রা মৌজার আরএস ৬৭২ নং দাগের ১৮ শতাংশ খাস জমিও দখল করে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করে সে। সরেজমিনে, স্থানীয় ভূমি অফিসে কাগজপত্র পর্যালোচনা ও এলাকাবাসির সাথে কথা বলে ঘটনার সত্যতা মেলে। স্থানীয় জিমির আলী (৭৫) বলেন, পিয়ারা পাগলা একজন কামেল লোক ছিলেন। রাতের আঁধারে মাজারটি ভেঙ্গে ফেলায় আমরা মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছি।

প্রতিবেশী কমলা খাতুন (৬৫) বলেন, রাত ২টার দিকে শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি খোকন ও তার মামা আহাম্মদ আলী অনেক লোকজন নিয়ে মাজার ভাঙছে। তাদের বাধার মুখে আগাতে পারিনি। এই শোকে আমরা তিনদিন না খেয়ে ছিলাম। স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার শাহ্জাহান বলেন, মাজারটি সরকারি খাস জায়গার মধ্যে। গভীর রাতে প্রায় অর্ধশতাধিক লোকজন মাইক্রোবাসযোগে এসে মাজারটি ভেঙ্গে ফেলে। খোকনের মামা আরশেদ আলী (কালু মাস্টার) মাজার ভেঙ্গে ফেলা প্রসঙ্গে বলেন, দিনের বেলা একটা হট্টগোল হওয়ার  সম্ভাবনা থাকায় কাজটা রাতে করা হয়েছে। থানায় জিডিও করে রাখা ছিল। খাস জায়গার কথা তিনি অস্বীকার করেন। অভিযুক্ত দেওয়ান জহিরুল ইসলাম খোকন সন্ত্রাসী নিয়ে মাজার ভেঙ্গে ফেলার কথা অস্বীকার করে বলেন, যাদের মাজার এটা তাদেরই ওয়ারিশান সম্পত্তি। তারা কোর্টে নোটারী ও থানায় জিডি করে আমাদের বাড়ী থেকে তারা মাজার নিয়ে গেছে। খাস জায়গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আমার মা-বাবার ক্রয়কৃত সম্পত্তি।

বায়রা ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মোঃ সাহাবুদ্দিন বলেন, মাজারসহ আশপাশে সরকারি খাস জায়গা আছে কিনা আমি অবগত নই। বায়রা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান জিন্নাহ্ লাঠু বলেন, আমি শুনেছি খোকন তার মামা আহাম্মদ আলী ও কালু মাষ্টারের নেতৃত্বে একাধিক মাইক্রোবাস, হোন্ডা ও একটি ট্রাকসহ সন্ত্রাসীদল অস্ত্র নিয়ে এসে মাজার হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে। মাজারের জায়গাটা সরকারি খাস সম্পত্তি। আমি শীঘ্রই পরিমাপের মাধ্যমে খাস জমি উদ্ধার ও ভেঙ্গে ফেলা  মাজারটি সংস্কার করে আগামীতে মেলা করবো। আর্থিক সুবিধা নেয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি আরো বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান হিরু একটা টিভিএস হোন্ডা নিয়ে খোকনের পক্ষ নিয়েছে।

দেওয়ান মনিরুজ্জামান হিরু মোটর সাইকেল নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, মাজারটি সরকারি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি মাজারটি পুন:নির্মাণেরও দাবি জানান।

এ ব্যাপারে সিংগাইর উপজেলা অফিসার মোঃ যুবায়ের বলেন, এসিল্যান্ড সাহেবের সাথে কথা বলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিব।