দুই সিদ্ধান্তে উজ্জীবিত হবে ব্যাংক খাত, আশা অর্থনীতিবিদদের

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যাংক খাতে সৃষ্ট তারল্য সংকট এবং এর ফলে অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়া সুদ হার নিয়ন্ত্রণে আনতে গৃহীত দুই সিদ্ধান্ত–সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) এক শতাংশ কমানোয় ব্যাংকিং খাতকে উজ্জীবিত করবে মনে করছেন দেশের ব্যাংক খাতের অর্থনীতিবিদরা। তবে এই দুই সিদ্ধান্তের ফলে যে পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের হাতে আসবে তা ভালো উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ভালো বিনিয়োগে খাটাতে হবে বলে মত দিয়েছেন তারা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘সিআরআর এক শতাংশ কমানোর ফলে যে অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে আসবে এবং সরকারি আমানতের যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে তা ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই করে ভালো উদ্যোক্তাদের দিলে বা ভালো বিনিয়োগে খাটানো হলে অবশ্যই ব্যাংক খাতের জন্য ইতিবাচক হবে। অর্থনীতির জন্যও ভালো হবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের জন্য এটি খুবই ভালো হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের মতোই বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। কাজেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ৫০ শতাংশ কেন, শতভাগই বেসরকারি ব্যাংকে রাখলেও কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। যেকোনও প্রতিষ্ঠান তার পছন্দ অনুযায়ী ব্যাংকে যতটুকু প্রয়োজন আমানত রাখবে। কোনও সীমা থাকা ঠিক নয়।’ সিআরআর কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংকটকালীন মুহূর্তে সিআরআর এক শতাংশ কমানোর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের উন্নতি হবে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে সিআরআর কমানো হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের আহ্বানে রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে হবে। এছাড়া ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) এক শতাংশ কমানো হয়। সিআরআর কমানোর ফলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে যাবে।

ত্রিপক্ষীয় ওই বৈঠকে গভর্নর ছাড়াও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত,  অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান, উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী ও বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে ওই দুই সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রীর এই দুটি ঘোষণায় কেবল ব্যাংকিং খাতই নয়, শেয়ারবাজারেও নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে শেয়ারের দামে। রবিবার ও সোমবার বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের ঊর্ধ্বগতি। এ প্রসঙ্গে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মিলে যে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে ব্যাংক খাতে সৃষ্ট সংকট অচিরেই দূর হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি ব্যাংকের তারল্য সংকট কেটে যাবে। আর তারল্য সংকট কেটে গেলে সুদের হার এক অঙ্কে নেমে আসবে।’ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সিআরআরের টাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোরই টাকা। ১০ বছর ধরে নিজের কাছে রাখলেও এই টাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও উপকার হয়নি। মূল্যস্ফীতি কমাতেও কোনও ভূমিকা রাখেনি সিআরআরএর টাকা।’

সরকারি সংস্থাগুলো এতদিন তার তহবিলের ৭৫ শতাংশ অর্থ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে জমা রেখে আসছিল। বাকি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত তারা রাখতে পারত বেসরকারি ব্যাংকে। এখন থেকে যেকোনও সরকারি সংস্থা তার তহবিলের ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে পারবে। আর সিআরআর কমানোর কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা চলে যাবে।

বৈঠক শেষে সিআরআর কমানোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি আগামী জুনে পর্যালোচনা (রিভিউ) করা হবে। এই সময়ের মধ্যে কী প্রভাব পড়ে, তা দেখতে হবে। আর জুনের মধ্যে পর্যালোচনা করার পরামর্শটা দিয়েছেন সালমান এফ রহমান। আমার কাছে তা ভালো লেগেছে। যদি দেখা যায় বিষয়টা কার্যকর হচ্ছে, তাহলে তো ভালো। নইলে আরও কিছু করতে হবে।’

বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, এটিই অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এবার তা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। সিআরআর কমানোতে মূল্যস্ফীতিতে কোনও চাপ পড়বে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘না, না, না।’ একইভাবে নজরুল ইসলাম মজুমদারও বলেন, ‘সিআরআর কমালে বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে টাকা পাবে, তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না।’

ব্যাংক খাতের উজ্জীবিত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, বৈঠকে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাতের সীমা (এডিআর) সমন্বয়ের সময় বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন সীমা ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। বর্তমান নিয়মে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই সীমা সমন্বয় করতে হবে। এছাড়া, সুদহার নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থা রেপোর মেয়াদ বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করলে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ সাত দিন রাখতে পারে। তা বাড়িয়ে ২৮ দিন মেয়াদ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রেপোর সুদহার ৬ দশমিক ৭৫ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নির্বাচনের বছরে ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ব্যাংকিং শুরু করলে ব্যাংকগুলোতে আমানত সংকট সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে ফারমার্স ব্যাংকের আর্থিক সংকট পুরো ব্যাংকিং খাতকে সংকটে ফেলে দেয়। এর ফলে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে সুদের হার। একযোগে সব ব্যাংক আমানতের ওপর সুদের হার বাড়িয়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীদেরও উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (একক অঙ্কে) নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ব্যাংকগুলোকে কেবল মুনাফা বৃদ্ধির কথা না ভেবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সুদের হার কমিয়ে আনার তাগিদ দেন তিনি।