প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ৬ মাসেও বাস্তবায়ন করেনি বিমান

স্টাফ রিপোর্টার : চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিমানের আসন খালিতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের ছয় মাস পেরুলেও তা আমলে নিচ্ছে না বিমান কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে আসন খালি রেখেই ফ্লাইট পরিচালনা করে যাচ্ছে রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যদিও বুকিং দিতে গিয়ে আসন পাচ্ছেন না যাত্রীরা। অন্যদিকে একই রুটে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো পূর্ণ যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। কীভাবে এ ধরনের অনিয়ম চলছে দিনের পর দিন? কার স্বার্থ রক্ষা করে চলছে বিমানের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ? বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। সেসময় প্রধানমন্ত্রী জানতে চান- ‘বিমানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে সিট খালি থাকে, অথচ বুকিং দেয়ার সময় সিট পাওয়া যায় না। কীভাবে এ ধরনের অনিয়ম চলছে দিনের পর দিন। কার স্বার্থ রক্ষা করে চলছে বিমানের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ।’

মন্ত্রীপরিষদ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমানের যাত্রীরা যখন বিমানের টিকিট করতে যান তখন বলা হয়, টিকিট নেই। বিমানে টিকিটের ক্রাইসিস দেখানো হলেও অনেক সময় বিমানে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গন্তব্যস্থলে রওনা হয়। অথচ বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোতে যাত্রী ভরা থাকে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিমান থেকে যখন টিকিট পায় না তখন যাত্রীরা বেসরকারি অন্য এয়ারলাইন্সে গিয়ে টিকিট কাটে, এটা কেন হয়? তবে কি বিমান সংশ্লিষ্টরা অন্য এয়ারলাইন্স থেকে সুবিধা পায়?

তৎকালীন বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে বিমানের স্টেশন ম্যানেজারদের চাপ দিন। বিমানের টিকিট সংগ্রহ করতে যাত্রীরা গেলে তারা বলেন, সিট খালি নেই। আবার দেখা যায়, ওই ফ্লাইট সিট খালি নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। তাই ওই স্টেশন ম্যানেজারদের ওপর নজর রাখুন। তারা সব চোর, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনুন। তাদের অপকর্মের খোঁজ-খবর নিন। এরা বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ বিমান ও দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে।

তার এই নির্দেশনার ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি বিমান কর্তৃপক্ষ। এমনকি প্রশ্ন তোলার বিষয়েও কোনো জবাব দেয়নি বিমান। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও বিমানের পক্ষ থেকে কেন কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এমন প্রশ্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের পরিচালক আলী আহসান বাবু কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

মার্কেটিং বিভাগের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিমানের মার্কেটিং বিভাগের বর্তমান পরিচালকের ইচ্ছায় সব হয়। এখানে কারো কোনো মতামতের গুরুত্ব নেই। জানা গেছে, মার্কেটিং বিভাগকে লেজেগোবরে করে রাখলেও তাকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্রাহক সেবা’ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেখানে ক্রু’দের অভ্যন্তরীণ কাঁদা ছোড়াছুড়ির বিচার-আচার করতে করতেই দিন পার করেন ওই পরিচালক। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চারটি রুটে ভ্রমণ করা যাত্রীদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে ঢাকা-লন্ডন রুটে বিমানের মোট আসন ছিল ৩৬ হাজার ৪৫৩টি। এর মধ্যে টিকিট বিক্রি হয়েছে ২৫ হাজার ৩০৩। ওই তিন মাসে এ রুটে ১১ হাজার ১৫০টি আসন ফাঁকা ছিল। অর্থাৎ ৩১ শতাংশ আসন ফাঁকা রেখেই এ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটে ওই তিন মাসে যে ফ্লাইটগুলো চলাচল করেছে তাতে মোট আসন ছিল ২৯ হাজার ১৬০। টিকিট বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার ১৩২। আসন ফাঁকা ছিল ১০ হাজার ২৮। এ রুটে ৩৪ শতাংশ আসনই খালি ছিল। ঢাকা-দুবাই রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আসন ছিল ২৮ হাজার ৭৩৪। টিকিট বিক্রি হয়েছে ২২ হাজার ১৩৮। তিন মাসে এ রুটে আসন ফাঁকা ছিল ছয় হাজার ৫৯৬। অর্থাৎ ২৩ শতাংশ আসন ফাঁকা রেখেই এ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলো চলাচল করেছে। ঢাকা-দোহা রুটে চলাচলরত ফ্লাইটগুলোতে মোট আসন সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৭৪১। টিকিট বিক্রি হয়েছে ২১ হাজার ২৩৮টি। এ রুটে আসন ফাঁকা ছিল দুই হাজার ৫০৩টি। অর্থাৎ ১০ শতাংশ আসনই ফাঁকা ছিল। এ রুটটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লাভজনক রুটগুলোর অন্যতম। এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, কাউন্টারে গিয়ে টিকিট পায়নি আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কেউ এমন কোনো অভিযোগ করেনি। করলে আমরা ব্যবস্থা অবশ্যই নেব।