নানা অর্জনের পরও সমস্যা পিছু ছাড়ছে না তৈরি পোশাক খাতের

স্টাফ রিপোর্টার : রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনের দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাত নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছে। তবে সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশের এই পোশাক শিল্প এখন সারা বিশ্বে রোল মডেল। সম্প্রতি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল সারা বিশ্বে যে দশটি সেরা ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ নির্বাচন করেছে তার সাতটিরই অবস্থান বাংলাদেশে। এছাড়া বাংলাদেশের আরও ৬৭টি ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ রয়েছে উৎপাদনে। আরও ২৮০টি কারখানা বর্তমানে ইউজিবিসি কর্তৃক সার্টিফিকেশনের অপেক্ষায় রয়েছে। এত অর্জনের পরেও তৈরি পোশাক খাতে নানাবিধ সমস্যা এখনও পিছু ছাড়ছে না—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, রানা প্লাজায় ধস ও তাজরীন ফ্যাশনস দুর্ঘটনার পর বায়ারদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সসহ বিভিন্ন বায়ারদের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম আরও অনেক কারখানা। গত বছর পোশাক শিল্পের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে রেকর্ড পরিমাণে। এই প্রবৃদ্ধি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত মাস্টার্স প্রোগ্রাম ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস অ্যান্ড লেবার স্টাডিজ’-এর ‘বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স’ বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির। সেখানে তিনি জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় গার্মেন্ট সেক্টরে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৮ শতাংশ।’ সূত্র জানায়, পোশাকশিল্প শ্রমিকরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কমপ্লায়েন্স খাতে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু, তারপরও তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া না দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়তই অস্থির হয়ে ওঠে তৈরি পোশাক খাত। কখনও বেতন-ভাতা ঠিকমতো পরিশোধ না করা, কখনও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দেওয়া না দেওয়া, কখনও কারখানার ওপর মহলের কর্মকর্তাদের মাত্রাতিরিক্ত নজরদারি, কখনও নোটিশ ছাড়াই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া, কখনও কারণে অকারণে শ্রমিক ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে দেশের তৈরি পোশাক খাতের এই শিল্প অস্থির হয়ে ওঠে। এটিকে কেন্দ্র করে নানা সংবাদ, আলোচনা, সমালোচনা এবং নানা কর্মসূচি এ শিল্পের বিদ্যমান অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই সেক্টর নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিথ্যাচার করছে। তাই হলুদ সাংবাদিকতা আর কিছু মানুষের নিচু মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে বলে মনে করেন এফবিসিসিআইর সভাপতি মোহম্মদ শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনের ঘটনায় নেতিবাচক সংবাদের জেরে আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এর কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি তো হয়েছেই, কনফিডেন্স আর সুনামও নষ্ট হয়েছে।’ মহিউদ্দিন আরও বলেন, ‘শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পোশাক খাতে দক্ষ ও যোগ্য জনবল তৈরিতে খাত উপযোগী কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে।’ এই খাতে যেভাবে প্রয়োজন, সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে হবে বলে জানান তিনি।  শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি কাজ করছে। তবে এই শিল্পের শ্রমিকদের লিভিং ওয়েজ’র পর্যায়ে আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্প অবশ্যই একদিন লিভিং ওয়েজের পর্যায় আসবে। এ বিষয়ে ব্র্যান্ড-বায়ার সংগঠনগলোকে তৈরি পোশাকের মূল্য বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্ববান জানানো হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিল্পের কলকারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। শুধু গার্মেন্ট শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় দেখার জন্য ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানা এখন শতভাগ কমপ্লায়েন্স। তাজরীন ও রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সব ধরনের নেতিবাচক ধারণা পাল্টে দিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ এখন নতুন ব্র্যান্ডের নাম।’  এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখন সারা বিশ্বে পরিচিত। তাজরীন ও রানা প্লাজা ধসের পরে নেতিবাচক অবস্থা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য আগামীতে দেশের রফতানি বাণিজ্যে আরও বেশি অবদান রাখবে।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯-৯০ অর্থবছর এই খাতে আয় হয়েছিল মাত্র ৬২ কোটি ডলার। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি আয় ২২৩ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দা দেখা দেওয়ার পর তৈরি পোশাক রফতানি কমে যাবে এমনটা অনেকে আশঙ্কা করেছিল। চীন, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বমোট পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৬৫৩.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের বেশি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে।  ৯০ দশকে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে এই শিল্প পায় নতুন মাত্রা। বর্তমানে এই শিল্পে মোট শ্রমিকের ৮০ ভাগ নারী। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামে শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে বিজিএমইএ’র আরও একটি হাসপাতাল নির্মাণাধীন। পোশাক শিল্পের রফতানি আয়ের ০.০৩ শতাংশ লভ্যাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে জমা হচ্ছে। যা শ্রমিকদের উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে। চলতি বছর এ তহবিলে প্রায় ৮০ কোটি টাকা জমা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।