অসুস্থ আসামি হাজির করায় ক্ষুব্ধ ট্রাইব্যুনাল

স্টাফ রিপোর্টার : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ শহীদুল্লাহ (৭৫) শারীরিকভাবে মুমূর্ষু হওয়া সত্ত্বেও তাকে আদালতে উপস্থিত করায় এক প্রসিকিউটরের ওপর ক্ষোভ জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউটর এই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের অনুমতি চান। তবে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে যিনি কথাই বলতে পারছে না, তার বিরুদ্ধে এ অবস্থায় কী করে অভিযোগ গঠন করা সম্ভব?

আসামিকে উপস্থিত করার সময় কোনও সিনিয়র প্রসিকিউটর উপস্থিত না থাকায় তাদের তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠান ট্রাইব্যুনাল। পরে ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে জামিনে থাকা এ আসামিকে চিকিৎসা করানো ও তার শারীরিক-মানসিক অবস্থার মেডিক্যাল রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আজ বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনা ঘটে।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবুল কালাম আযাদ। আসামিপক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান, মাসুদ রানা প্রমুখ। তবে অন্য এক মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল।

শুনানির শুরুতে স্ট্রেচারে করে আসামিকে এজলাসে নিয়ে আসা হয়। পরে বিচারপতিগণ আসামির শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার বিষয়ে সিভিল সার্জনের একটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন। তখন প্রসিকিউটর আবুল কালাম আযাদের কাছে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে যিনি কথা বলতে পারছেন না, তার বিরুদ্ধে এ অবস্থায় কী অভিযোগ গঠন করা সম্ভব?

এ সময় প্রসিকিউটর কালাম এ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের অনুরোধ জানালে ট্রাইব্যুনাল ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আদালত বলেন, ‘বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে আসামি কথা বলতে পারছেন না। তার আরও চিকিৎসা প্রয়োজন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে হলে তাকে তা শুনতে হবে এবং তিনি দোষী বা দোষী ননÍসে বিষয়ে উত্তর দিতে হবে। এ অবস্থায় কীভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে বলছেন? আপনার সিনিয়র প্রসিকিউটররা কোথায়? যান, সব সিনিয়র প্রসিকিউটরকে এখনই ট্রাইব্যুনালে ডেকে নিয়ে আসুন। টিভিতে কেক কাটতে পারেন, এখানে আসতে পারেন না?’

এরপর প্রসিকিউটর কালাম সিনিয়র প্রসিকিউটরদের ডাকতে এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন। এ সময় আসামির ছেলে আশরাফ ফারুকের কাছে তার বাবার ও তাদের নিকট আত্মীয়দের অসুস্থতার ইতিহাস জানতে চান ট্রাইব্যুনাল।

অন্য মামলায় উপস্থিত প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদলকে লক্ষ্য করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আসামি কথা বলতে পারেন না, অথচ কালাম সাহেব (প্রসিকিউটর) চার্জ ফ্রেম (অভিযোগ গঠন) করতে বলছেন কেন? নিয়ম কী? তাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে আনা হয়েছে, বসা রোগী হলেও না হয় বুঝতাম।’

ট্রাইব্যুনালের বক্তব্যের সঙ্গে প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান সহমত পোষণ করেন। তখন ট্রাইব্যুনাল আবারও বলেন, ‘একজন মানুষ (আসামি) কথা বলতে পারেন না, শুনতে পারেন না, শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ নন; অথচ আমরা লিখে দেবো তার বিরুদ্ধে চার্জ ফ্রেম করা হলো। এটা তো হবে না।’

এ সময় ট্রাইব্যুনালের এজলাসে প্রসিকিউটর কালাম চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে নিয়ে প্রবেশ করেন। তখন ট্রাইব্যুনাল আসামির বিরুদ্ধে চার্জ ফ্রেমের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আসামির সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার পক্ষে মত দেন।

এরপর ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে জামিনে থাকা এ আসামিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল অথবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা করাতে এবং প্রতি মাসে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মেডিক্যাল রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ শেষে এজলাসে প্রবেশ করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম। তখন ট্রাইব্যুনাল তার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি আসলেন, কিন্তু সময়মতো আসলেন না।’ জেয়াদ আল মালুম বলেন, ‘অফিসে কিছু কাজ ছিল। তাই আসতে দেরি হলো।’ এরপর বিচারপতিরা এজলাস কক্ষ ছেড়ে খাস কামরায় ফিরে যান।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩১ অক্টোবর ক্যাপ্টেন মো. শহিদুলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন প্রসিকিউটর আবুল কালাম আযাদ। পরে তিনি জানান, একাত্তরে মানবতাবিরোধী পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার একজন ক্যাপ্টেন শহিদুল্লাহ। ট্রাইব্যুনালের বিচারের মুখোমুখি হওয়া আর্মি অফিসারদের মধ্য তিনিই প্রথম।

২০১৬ সালের ২ আগস্ট ক্যাপ্টেন শহিদুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে কারাগারে পাঠান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ক্যাপ্টেন শহিদুল্লাহ ১৯৬২ সালে প্রথম পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ১৯৬৭ সালে কমিশন্ডপ্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হন। এরপর ১৯৬৯ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭০ সালে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ক্যাপ্টেন শহিদুলকে তার নিজ এলাকা কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পাঠানো হয়। সেখানে শহিদুলের নেতৃত্বে প্রায় দেড়শ পাকিস্তানি সেনাসদস্য নিয়ে স্থানীয় স্কুল ও ডাকবাংলোয় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এরপর ওই এলাকায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো হয়।