নির্বাচনী আইনে আসছে ২৭ সংশোধন

স্টাফ রিপোর্টার :গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরইমধ্যে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে ২৭টি সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে ইসির আইন সংস্কার কমিটি। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে প্রার্থী হতে অথবা প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেতে আয়কর সনদ জমা দিতে হবে। আগামী এপ্রিলে এ খসড়া প্রকাশ করবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ইসির সহকারী সচিব রওশন আরা বলেন, ‘বর্তমানে প্রার্থীরা ইসির নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে হলফনামা জমা দেন। সেখানে ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেটের টিআইএন নম্বরটা লিখে দিতেন। অনেক সময় যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হতো না। এ কারণে প্রার্থীদের ইনকাম ট্যাক্সের সার্টিফিকেটসহ যাবতীয় কাগজ জমা নেয়ার সুপারিশ করেছে আইন সংস্কার কমিটি।’
তিনি বলেন, ‘ভোটের সময় পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইসির সে পরিমাণে জনবল নেই। এ কারণে ইসির বাইরের জনবল দিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ করা হয়। এসব প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগের আগে ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।’
এদিকে ভোট চলাবস্থায় কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে পোলিং এজেন্টদের অভিযোগের প্রবণতায় লাগাম টানতে যাচ্ছে ইসি। এ লক্ষ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোলিং এজেন্টদের নির্দিষ্ট ফরমে স্বাক্ষরের বিধান চালু হচ্ছে। পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে উপস্থিতি, ভোট কক্ষ থেকে বের হওয়া ও ফিরে আসার পর এ ফরমে স্বাক্ষর করতে হবে। খসড়া তালিকায় ইভিএমে ভোট গ্রহণ ও নির্বাচনের কাজে নিয়োজিতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলির ক্ষমতা, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থিতা সহজ করা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাজা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন তিন বছর করার প্রস্তাব করেছে আইন সংস্কার কমিটি। নির্বাচনী অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া, জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘন সম্পর্কে খোঁজ নিতে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে এ খসড়ায়।
আইন সংস্কার কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ‘দুটি বিষয় ছাড়া আরপিও সংশোধনের খসড়া মোটামুটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিষয় দুটি হচ্ছে, আগাম ভোটিং ও নির্বাচনী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা। এ দুটি বিষয়ে নতুন কিছু করা যায় কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। কারণ নবম সংসদ নির্বাচনের পর আরপিও সংশোধনীর সময় এটি বাদ দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনের সময় চাইলে আমরা অন্য আইনে সেনা মোতায়েন করতে পারব।’
খসড়া তালিকায় ২৭টি আইন সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭(৫) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো জেলায় দুজন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা যেতে পারে। ৭(৬) ধারায় বলা হয়, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রত্যাহারের পাশাপাশি বদলি করা যাবে। ৮(২) ধারায় বলা হয়েছে, ২৫ দিন আগের স্থলে ভোটের ১৫ দিন আগে কেন্দ্রের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে। ৯(১) ধারায় বলা হয়, তিন দিন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্যানেল উন্মুক্ত রাখতে হবে। ১২(১)(সি) ধারায় বলা হয়, ঋণখেলাপিদের জটিলতা কমাতে মনোনয়ন দাখিলের সাত দিন আগের পরিবর্তে দাখিলের আগের দিন তা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। ১২(৩) ধারায় বলা হয়, অনলাইনে মনোনয়ন দাখিলের বিধান যুক্ত করা, আইসিটি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হবে। ১২(৩এ)(এ) ধারায় বলা হয়, স্বতন্ত্র প্রার্থিতার সুবিধার্থে নির্বাচনি এলাকার মোট ভোটারের ১% এর পরিবর্তে এক হাজার ভোটার সমর্থন তালিকা জমার বিধান করতে হবে। ১২(৩এ)(সি) ধারায় বলা হয়, প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ১২ ডিজিটের টিআইএন সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। ১২(৩বি)(এ) ধারায় বলা হয়, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ অথবা মার্কশিট জমা দিতে হবে। ১৩ (১)(এ) ধারায় বলা হয়, জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা যেতে পারে। ১৬(১) ও ১৯(১) ধারায় বলা হয়, বিদ্যমান বিধানকে সহজ করতে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী হলে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা, সহজীকরণ করতে হবে। ২০(এ) আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নতুন বিধান সংশোধন করতে হবে। ২২(১) ধারায় বলা হয়, প্রার্থীদের সুবিধার্থে নির্ধারিত ফরমে পোলিং এজেন্ট নিয়োগে সংশোধনী আনতে হবে। ২২(৩) ধারায় বলা হয়, পোলিং এজেন্টকে প্রার্থীর প্রতীক সংবলিত কার্ড না দিয়ে ইসির পরিচয়পত্র দেয়া হবে। ২২(এ) ধারায় বলা হয়, পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ২৭(১)(২) ধারায় বলা হয়, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভোট নিশ্চিতে আগাম ভোটিং ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ৩১(১) ধারায় বলা হয়, ইভিএমে ভোট নিতে হলে এ অনুচ্ছেদেও সংশোধন আনতে হবে। ৩৭(২) ধারায় বলা হয়, রিটার্নিং অফিসারকে আইনত প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের ব্যালট পেপার ও মালামাল সংবলিত ব্যাগ খুলে পুনঃনিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা সংশোধন করতে হবে। ৩৮ ধারায় বলা হয়, লটারির পরিবর্তে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের বিধান সংশোধন করতে হবে। ৩৯(১) ও ৩৯(২) ধারায় বলা হয়, এতে আরও দুটি অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনতে হবে। ৪৪বি(৬) ধারায় বলা হয়, নির্বাচনি ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখা ও অবৈধ প্রভাব রোধে মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ৪৪সিসিসি(৫) ধারায় বলা হয়, সময়ের বাস্তবতায় নির্বাচনি ব্যয় যথাসময়ে দিতে ব্যর্থ হলে ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা। ৪৪ই(২) ধারায় বলা হয়, সুষ্ঠু নির্বাচনে ব্যর্থ হলে সরাসরি বদলি করার বিধান করে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সংশোধন করতে হবে। ৯১সি(৮) ধারায় বলা হয়, ভোটে কর্মকর্তাদের অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব, দল বা প্রার্থীর অনিয়ম, আচরণবিধি লঙ্ঘনে খোঁজ নিয়ে তৃতীয় চোখ নিয়োগ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ইসি কর্মকর্তাদেরও পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয় বলে সংশোধন করতে হবে। ৯১(এ) এ ধারায় বলা হয়, নির্বাচনি অভিযোগ দাখিল ও নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে বিভিন্ন দেশে। অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপনের বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।