রোহিঙ্গাদের চাপে বিপন্ন কক্সবাজারের স্থানীয়রা, বাড়ছে অসন্তোষ

ফুলকি ডেস্ক : মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সীমান্ত উন্মোচন করে দিয়েছিল বাংলাদেশ। আর দেশের কক্সবাজার উপকূলের মানুষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন হৃদয়ের সীমান্ত। জাতীয়তার গণ্ডি অতিক্রম করে তারা আশ্রয় হয়েছিল পৃথিবীর সবথেকে বিপন্ন আর ভাগ্যহারা ওই শরণার্থীদের। তবে গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে ধেয়ে আসা রোহিঙ্গা স্রোতের টান লেগেছে কক্সবাজারের আর্থসামাজিক বাস্তবতায়। সেখানকার আর্থসামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। রোহিঙ্গাদের মতোই বিপন্ন হয়ে পড়েছে তারা। অতিরিক্ত ৭ লাখ মানুষের চাপে হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার বনভূমি ও জীজবৈচিত্র্য। এশিয়াভিত্তিক ক্যাথলিক সংবাদমাধ্যম ইউসিএ এক সরেজমিন অনুসন্ধান শেষে জানিয়েছে, একইরকম বিপন্ন হয়ে পড়ায় রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি কমছে কক্সবাজারের মানুষদের। বাড়ছে অসন্তোষ। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ।  যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা  বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিল তখন সবার প্রথমে তাদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় স্থানীয় জনগণ। পানি, খাবার ও আশ্রয় দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় তারা।

রোহিঙ্গাদের দূরের মনে না করে কাছে প্রথম থেকেই কাছে টেনে নিয়েছিল স্থানীয়রা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ ও স্থানীয় জনগণের প্রশংসা করেছিল আন্তজার্তিক সম্প্রদায়। জাতিংঘের তিন সংস্থার এক যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল,‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নিশ্চিতে সীমান্ত খুলে দিয়েছে। পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা আর আশ্রয়। রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয়দের আর্তি আর উদারতা আমাদের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে গেছে।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংগঠনও বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে। প্রশংসা করেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ীরা। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে স্থানীয় জনগণের ওপর।  জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে, কমে গেছে আয়ের উৎস। এখনও ঘৃণা নেই, তবে কিছু অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে বলে জানায় ইউসিএ নিউজ।  এসময় তারা তুলে ধরে আক্কাস আলি নামে এক স্থানীয়ের গল্প। কক্সবাজার থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে থাংখালি গ্রামের বাজার। ইউসিএ নিউজ সরেজমিন অনুসন্ধানে জানায়, বাজারে বিষন্ন মনে চা খাচ্ছিলেন আক্কাস আলি। ভাবছিলেন কিভাবে পরিবারের খাবার জোটাবেন। কক্সবাজারে অনেকদিন ধরেই চার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করে আসছেন তিনি। ছেলেকে নিয়ে পরিবারের জন্য রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে যান। ছয় মাস আগে প্রতিদিন দিনে ৮০০ টাকা আয় হতো তাদের। কষ্ট করে হলেও দিন চলে যেত একরকম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি তেমন নেই। আক্কাস আলি বলে, এই মুহূর্তে দিনে ৩০০ টাকা আয় হলেই ভাগ্যবান মনে হয় নিজেকে। আর এই পরিস্থিতির জন্য তিনি দায়ী করেন চলমান রোহিঙ্গা সংকটকেই। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ইতোমধ্যে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব প্রশ্ন তুলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ছাড়া আর কী নামে ডাকা হবে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এরপর সরকারের পাশে এসে দাঁড়ায় জাতিসংঘসহ অনেক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংগঠন। তবে আক্কাস আলির অভিযোগ, ‘সাংবাদিক ও ত্রাণ কর্মীরা এখানে শুধু রোহিঙ্গাদের কথাই শুনতে আসে। এই সংকট স্থানীয়দের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে সেটা জানতে চান না কেউ।’  তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ত্রাণ পায়, সহানুভূতি পায়। আমরা কিছুই পাই না। অথচ আমরাও প্রায় তাদের মতোই দুর্ভোগে আছি।’ গত আগস্টের রোহিঙ্গাঢলের আগে থেকেই তিন লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে বসবাস করতো। তাদের সবাই মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার। হত্যা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসলে স্থানীয়রা তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের যা আছে তাই দিয়ে বরণ করে নেয়।  প্রায় ৭ লাখ মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, পোশাকের পাশাপাশি নিজ ভূমিতে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয়রাই এগিয়ে আসে। কক্সবাজারের দুই কৃষক ৭৬টি রোহিঙ্গা পরিবারের আশ্রয় দিয়ে অনন্য মানবিকতার নজির গড়েন। মোহাম্মদ করিম নামের এক কৃষক নিজের ভূমিতে আশ্রয় দেন ৪০টি পরিবারকে। পৃথিবীর সবথেকে বিপন্ন ওই জনগোষ্ঠীর দুর্দশায় নিশ্চুপ থাকতে পারেননি তিনি। আরেক কৃষক খালেদা বেগম আশ্রয় দেন ৩৬টি পরিবারকে। এজন্য নিজের বাগানের দুই শতাধিক গাছ কেটে ফেলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। মানবিক আর্তিতে সাড়া দেওয়াটাই তার আনন্দ। এই দুই কৃষক রোহিঙ্গাদের শরণার্থী থেকে রূপান্তর করেছেন প্রতিবেশিতে। যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে চারপাশজুড়ে অপরাধকর্মের ভয়, সেই সম্প্রদায়কেই নিজেদের নিরাপত্তা মনে করেছেন তারা। করিম আর খালেদার মতো স্থানীয়দের উদ্যোগে সামিল হয় বাংলাদেশ সরকারও। সামিল হয় স্থানীয় ও বৈশ্বিক সহযোগিরাও। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারের সমাজ ও অর্থনীতিতে। জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক থাকছে না। কক্সবাজারে চাকরি ও আয়ের ক্ষেত্রও ছোট হয়ে এসেছে। আক্কাস আলি নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা ইউসিএ নিউজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ত্রাণ পায় এবং কাজ করলে দৈনিক ১০০-১৫০ টাকাও পায়। আমরা তাদের সহানুভূতি দেখিয়েছি, সাহায্য করেছি। কিন্তু আমরাও এখন বিপদে আছি।’

কক্সবাজারে বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা শিবির আছে। উখিয়া থেকে লেদা পর্যন্তই অনেকগুলো আশ্রয় শিবির। অনেক নির্মাণ কাজ চলছে সেখানে। তাদের আশ্রয়ে ভবন তোলা হচ্ছে। ফলে বন ও কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু রোহিঙ্গা নয়, সরকারি কর্মকর্তা, ত্রাণকর্মীদের জন্যও জায়গা প্রয়োজন সেখানে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ১২১৪ হেক্টর জমি বরাদ্দ করে সরকার। যার বেশিরভাগই ছিল বনভূমি। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্পের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা শিবিরের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয়দের স্বাস্থ্য, পানি, জীববৈচিত্র, ভূমি ও বন ২৮ রকম হুমকির মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘বন উজার করা হয়েছে। সেখানকার প্রাণীরা বিলুপ্ত হচ্ছে। কৃষিজমিতেও গড়ে তোলা হচ্ছে ভবন। এর সুফল পাচ্ছে গুটিকয়েক মানুষ, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবাই।’

পালংখালি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান গফরউদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে স্থানীয়দের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে অনেক পান ও তরমুজ বিক্রি হতো। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীরা অন্য জায়গা থেকে কিনছে কারণ এখানেই চাহিদা অনেক বেশি, দামও বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কৃষিজমি বিলুপ্ত হওয়ায় আমরা ফসল ও সবজি কম ফলাতে পারছি। গরু-বাছুরকে ঘাস খাওয়ানোরও জায়গা নেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্থানীয় শ্রমবাজারে ঝড় তুলেছে। স্থানীয়দের আয়ের উৎস কমে গেছে। তারা মিয়ানমারে ফিরে যাক আর না যাক কক্সবাজার আর আগের মতো হবে না।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, বন ও পাহাড় ধ্বংস করায় জীববৈচিত্রের ওপর প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে হাতি ও দুর্লভ পাখিগুলো হারিয়ে যেতে পারে। সরকার এমন স্থাপনা তৈরি করতে থাকলে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট স্থানীয়দের জীবনে প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, স্থানীয়রা দেখেছে যে তাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে, বন ধ্বংস হচ্ছে, কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের পুরো পরিবেশ এখন অন্যরকম।’

রোহিঙ্গারা কখনও দেশে ফিরে যাবে কি না তা নিয়েও সন্দিহান তারা। আবদুল মান্নান বলেন, স্থানীয়রা শরণার্থীদের ঘৃণা করেন না। কিন্তু আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অসন্তুষ্টি চলে এসেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাসের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান উইলিয়াম পিন্টু গোমেজ বলেন, তার সংস্থা সম্প্রতি স্থানীয় জনগণের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছেন তারা বেশিরভাগেই নেতিবাচক। তিনি বলেন, ‘আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের চাপে স্থানীয়রা হতাশ। কখনও কখনও তাদের অবস্থা শরণার্থীদের চেয়েও খারাপ। তাদের আয় কমে গেছে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেছে। তাই বিপাকে পড়েছেন তারা। বাংলাদেশের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রশংসা করে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক সংস্থা ও দেশ। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন তারা। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য ৪৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল জাতিসংঘ। জাতিসংঘ,ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কুয়েতের উদ্যোগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত  আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সম্মেলনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা (৩৬০ মিলিয়ন ডলার) সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

রোহিঙ্গাদের মতো স্থানীয়দেরও সহায়তা প্রয়োজন উল্লেখ করে পিন্টু গোমেজ বলেন, ‘স্থানীয় জনগণকে সহায়তা করা যেকোনও মানবিক কাজের প্রথম ধাপ। সংকট সমাধানে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। হয়তো দাতা সংস্থাগুলো এখনও প্রস্তুত নয়। তবে তাদের বুঝতে হবে যে এটা এড়ানো সম্ভব না।’