এয়ারপোর্ট-সায়েদাবাদ সড়কে পরীক্ষামূলক চালু হচ্ছে পৃথক লেনে বাস

স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্বব্যাংকের এক জরিপ প্রতিবেদন তুলে ধরে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলছে, ঢাকা শহরে যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসেবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্থিক ক্ষতির এ আনুমানিক পরিমাণ পাওয়া যায়। রাজধানীতে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। রাজধানীতে যানজট সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।

এমন সমস্যার মধ্যে সম্প্রতি ভিআইপিদের জন্য পৃথক লেনে যাতায়াতের একটি প্রস্তাব তোলা হয়। এ প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সে সময় রাজধানীর যানজট নিরসনে প্রধান সড়কগুলোতে ভিআইপি লেনের প্রস্তাব নাকচ করে গণপরিবহন চলাচলের জন্য আলাদা লেনের সুপারিশ করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। অন্যদিকে যানজটের সমস্যা থেকে উত্তরণে নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা পৃথক লেনে গণপরিবহন চলাচলের বিষয়ে দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, যানজট থেকে রক্ষা পেতে এবং পাবলিক পরিবহনের প্রতি সবাইকে আগ্রহী করতে পৃথক লেনে বাস চলাচলের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে এয়ারপোর্ট রোড থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত পৃথক লেনে পাবলিক বাস পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার চিন্তা করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। যানজট সমস্যার কথা মাথায় রেখে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ চিন্তা করছে এয়ারপোর্ট রোড থেকে প্রগতি স্বরণী, বাড্ডা, রামপুরা হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত পৃথক লেনে পাবলিক বাস চালু করতে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এটা হবে একটা পাইলট প্রকল্প। এখানে ভালো ফল পেলে পরবর্তীতে এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্য সড়কেও এ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এ প্রকল্পের বিষয়ে কেবল আলোচনা হয়েছে কিন্তু কীভাবে, কোন বাস চলবে আলাদা লেনে চলবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সবার সহযোগিতা পেলে খুব তাড়াতাড়িই এ সেবা চালু হবে।সম্প্রতি ‘পৃথক লেনে পাবলিক বাস-প্রস্তাবিত ভিআইপি লেনের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। সেখানে একটি জরিপ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নব্বয়ের দশকে ঢাকা পাবলিক পরিবহনের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার, ২০০৮ সালে এ সংখ্যা ছিল আট হাজার। নানা কারণে ২০১৫ সালে এ সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মাত্র তিন হাজারে। অন্যদিকে ২০১০ সালে রাজধানীতের ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল তিন লাখ ১৮ হাজার ৪৯৫। ২০১৬ সালে এসে তা দাঁড়ায় চার লাখ ৩৬ হাজার ৫৫। দিন দিন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে পাবলিক বাসের সংখ্যা হ্রাসের হার খুবই উদ্বেগজনক।

পবা’র মতে, ঢাকা মহানগরীতে যানজট হ্রাসে গণপরিবহনের দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে অপেক্ষার সময়, পরিবহনে ওঠা-নামা ও পরিবহন পরিবর্তনের সুবিধা সৃষ্টির পাশাপাশি গণপরিবহনের জন্য পৃথক লেন করা গেলে যাতায়াতের সময় অনেক কমে আসবে। এটি মানুষকে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে গণপরিবহনের সর্বোচ্চ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। গেল বছরের ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের বলা হয়, ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলকারী ছয় শতাংশ মানুষ ঢাকার ৭৬ ভাগ সড়ক দখল করে আছেন। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট সড়কের ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে থাকে। গণপরিবহনের দখলে থাকে ছয় থেকে আট শতাংশ। সড়কের বাকি অংশ বিভিন্নভাবে অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে থাকে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদাক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বলেন, আমাদের দেশে এখনও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। গণপরিবহনের সুবিধা না থাকায় অনেক পরিবারে ৩-৪টি করে ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। ফলে যানজট কমানো যাচ্ছে না। যেভাবে হোক ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে হবে। যানজট কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি এক লেনে গণপরিবহন চালু করা জরুরি। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমে গেলে রাজধানীতে যানজট কমে যাবে। যে কারণে গণপরিবহনের সুবিধা সৃষ্টি করে যাত্রীদের এখানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তাহলে অনেকেই চলাচলের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বের না করে গণপরিবহনে যাতায়াত করবেন। এ কারণে ভিআইপি লেনের চেয়ে গণপরিবহনের জন্য আলাদা লেন করলে তা কার্যকর পদক্ষেপ হবে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজ্জামেল হক বলেন, গণপরিবহনের জন্য পৃথক লেন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। এটি চালু করা গেলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে। সেই সঙ্গে সার্ভিস ভালো হলে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরাও গণপরিবহনে চলাচলে আগ্রহ দেখাবেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে যানজট কমে আসবে। পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের বলেন, ঢাকা শহরের অনেক রাস্তায় গণপরিবহন চলতে দেয়া হয় না। যানজট নিরসনে আমাদের দাবি, পৃথক লেনে গণপরিবহন চালুর পাশাপাশি সব রাস্তায় গণপরিবহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।