ধামরাইয়ে ৭টি হত্যার রহস্য ও খুনীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ

আবু হাসান, ধামরাই : ধামরাইয়ে গত দুই মাসে ছয়টি এবং দেড় বছর আগে দুইটি খুনের রহস্য ও খুনীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়া ছয়মাসেও নিখোঁজ গৃহবধূর সন্ধান মেলেনি। বিভিন্ন মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোন হত্যাকান্ডেরই রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ঘটনায় নিহতের স্বজনদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারী চৌহাট ইউনিয়নের দ্বি-মুখা বাজারের মিষ্টি ব্যবসায়ী সাটুরিয়া উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ী জগন্নাথপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আজিজুর রহমানের লাশ পাওয়া যায় বাজারের দক্ষিণ পাশে একটি ক্ষেতে। এঘটনায় মামলা হলেও রহস্য উদঘাটন এবং কোন আসামী শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী নান্নার ইউনিয়নের পাছাইল গ্রামের হাজী জিন্নত আলী (৫৫) দুর্বৃত্তদের উপর্যপুরি রডের আঘাতে আহত হয়ে এনাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। গত ৩১ জানুয়ারী  তিনি ও তার স্ত্রী রাশেদা বেগম (৪৫) প্রতিদিনের ন্যায় রাতে খাবার খেয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। ওই রাতের যেকোন সময়ে তাদের দু’জনকে রড় দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে দুর্বৃত্তরা। এতে মুমূর্ষুাবস্থায় তাদের দু’জনকে প্রতিবেশীরা এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় নিহতের ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। এতে নিহতের ছেলেকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। কিন্তু তার কাছ থেকেও কোন তথ্য কিংবা কোন রহস্য উদঘাটন কিংবা আসামীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। শনিবার রাতে এ মামলার বাদী ও নিহতের মেয়ে থানায় আসে মামলার অগ্রগতি জানতে। এরপর তারা সাংবাদিকদের জানায়, পুলিশ এখনো হত্যাকান্ডের কারণ বা রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। নিহতের একমাত্র ছেলে আবু বক্করকে আটক করে জেল হাজাতে প্রেরণ করে। তার কাছ থেকেও কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে অচিরেই এ মামলার রহস্য উন্মোচন করতে পারব।

নিহতের ছেলে আবু বক্কর ৫-৬ মাস আগে মা-বাবার অমতে স্বামী পরিত্যক্তা এক সন্তানের জননীকে বিয়ে করে। কিন্তু পরিবার থেকে তার এ বিয়ে মেনে নেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কারণে ছেলে  রাগের বশবর্তী হয়ে এ কাজ করেছে। পুলিশও এ ধারণা নিয়েই ছেলেকে আটক করেছে।

গত ২২ জানুয়ারী ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ে কালামপুর ছাপড়া ব্রীজের নিচ থেকে নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নাউতারা ভাটিয়াপাড়া গ্রামের মৃত আবদুল গফুরের ছেলে অটো রিক্সাচালক বকুল মিয়ার (৩২) দু’পা বেধে হত্যা করে রিক্সা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ মামলায় নিহতের স্ত্রী সাফিয়া বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামী করে থানায় মামলা করে। এ ঘটনায় কয়েকজন রিক্সাচোরকে আটক করলেও তাদের কাছ থেকে হত্যাকান্ডের বিষয়ে কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই কামরুজ্জামান। নিহতের ভগ্নিপতি রবিউল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে এ পর্যন্ত পুলিশ কাউকে শনাক্ত কিংবা রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।

গত ১৯ জানুয়ারী উপজেলার কুল্লা-আড়ালিয়া সড়কের সিতি-কাকনাইল এলাকায় সন্ধ্যার সময় নিলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার মৌজাপাঙ্গা গ্রামের মফিজার রহমানের ছেলে অটোরিক্সাচালক আমিজ উদ্দিন (৩২) কে গলাকেটে তার রিক্সাটি ছিনিয়ে নেয় দুুবর্ৃৃত্তরা। এতেও হত্যার রহস্য কিংবা আসামী শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এ মামলার বাদী মামাতো শ্যালক ইলিয়াস হোসেন দিলীপ। দুই রিক্সাচালকের হত্যার ঘটনায় রিক্সাপার্টসের দোকানদারসহ চারজনকে আটক করে জেল হাজাতে প্রেরণ করলেও তাদের কাছ থেকে কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই আলামিন শেখ বলেন, হত্যার রহস্য ও আসামী শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

গত ৬ জানুয়ারী উপজেলার শ্রীরামপুরে সুইডেস বেভারেজ ও এলাইড কাটিংস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামের পানি ও রং তৈরীর পরিত্যক্ত কারখানার ভিতর কারখানার দুই নিরাপত্তা কর্মী বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার মানিকপটল মরিচতোলা গ্রামের মৃত আফছের আকন্দের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৫) ও মানিকগঞ্জ সদর থানার শোলাকান্দা বকজুরী গ্রামের শহিদের ছেলে রাজা মিয়া (৫৭) কে  খুন করে দুর্বৃত্তরা। এঘটনায় সন্দেহভাজন চারজনকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তাদের কাছ থেকে কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) জাকারিয়া হোসেন। তবে অচিরেই রহস্য ও আসামী শনাক্ত করতে পারব বলে আশা করছি বলে তিনি জানান।

গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর কুল্লা ইউনিয়নের কাইজারকুন্ড গ্রামের শাহাদত হোসেনের স্ত্রী ঝর্ণা আক্তারের কাছে যৌতুক দাবী করে না পেয়ে তাকে বেদম মারপিট করে। এরপর থেকে ঝর্ণার সন্ধান নেই। এ ঘটনায় মেয়ের জামাইসহ সাতজনকে আসামী করে ঝর্ণার বাবা রওশন আলম বাদী হয়ে থানায় মামলা করে। এ মামলায় দেবর সাইদুল ও ননদ আমেনাকে আটক করে পুলিশ। এরপর থেকে ঝর্ণার স্বামী পলাতক রয়েছে। এ পর্যন্ত র্ঝণাকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ মামলার কোন কোল কিনারাও করতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেখ সজিব জানান, ঝর্ণাকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। মামলার বাদী রওশন আলম বলেন, পুলিশের পিছনে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেছি। আমাকে বারবার থানায় ডেকে নেওয়া হয়। কিন্তু আমার মেয়ের কোন সন্ধান দিতে পারেনি পুলিশ।

এছাড়া প্রায় দেড় বছর আগে বালিথা গ্রামের বিএনপি নেতা ফটোমিয়ার বাবা ফালুজ উদ্দিন (৮৫) ও তার মা ভানুবিবি প্রতিদিনের ন্যায় রাতের খাবার খেয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের কোন এক সময়ে তাদের দুজনকে উপর্যুপরি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলেই ফটোমিয়ার মা নিহত হন। মুমূর্ষুাবস্থায় ফালুজ উদ্দিনকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নয়দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফালুজ উদ্দিন। এ ঘটনায় ফটোমিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। ওই সময় ধামরাই থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহা মামলাটি তদন্ত করেন। ওই সময় নিহতের মেয়ের ঘরে নাতীসহ কয়েকজন মাদকসেবীকে আটক করা হয়। কিছুদিন পর মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হলে পিবিআই’র এস আই রেজাউল করিম তদন্ত করেন। তিনিও মামলার অগ্রগতি আনতে পারেননি। এরপর পিবিআই’র ইন্সপেক্টর শফিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করছেন। এ মামলার তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও এর কোন অগ্রগতি নেই। ঘুুরেফিরে শুধু পুরাতন আসামীদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে ইন্সপেক্টর শফিকুর রহমান বলেন, মামলার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না।

বিভিন্ন হত্যা মামলার বিষয়ে ধামরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মাদ রিজাউল হক বলেন, প্রত্যেক হত্যা মামলার তদন্ত আন্তরিকতার সহিত করা হচ্ছে এবং অযথা কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় এ জন্য প্রকৃত আসামীদের শনাক্ত ও রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে।