সিংগাইরে ফসলি জমিতে গড়ে উঠা ইটভাটা কৃষকের  গলার কাটা পরিবেশের উপর পড়ছে বিরুপ প্রভাব

মাসুম বাদশাহ্, সিংগাইর(মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : এক সময়ের সফল কৃষক বর্তমান ইটভাটা শ্রমিক চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর গ্রামের শকদ আলী (৫৬) এখন আর ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখেন না। তার জমিতে বিঘা প্রতি ৮ থেকে ১০ মণ সরিষা হতো। শেষ হতেই ইরি-বোরো ধানের ফলন হতো ২০ থেকে ২৫ মণ। তার পর বর্ষা মৌসুমে আমন ধান ফলন হতো ১০ থেকে ১২ মণ। এখন তার সেই  ফসলের স্বপ্নের জমিতে  গড়ে উঠেছে পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা। ফসল ফলানো যেন শকদ আলীর কাছে দুঃস্বপ্ন। তার মতোই একই অবস্থা ওই গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (৪৫), হূমায়ন কবির (৪৩) ও নজরুল ইসলামের (৫৫)।

 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবুজ-ছায়া সুনিবিড় এ উপজেলার ফসলি জমিতে ৭৫টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ইটভাটা আবাসিক এলাকা ঘেঁষে ৩ ফসলী জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। আরো প্রায় ডজেন খানেক ইটভাটা নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে ৩২টি ইটভাটার লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৪৩ টি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে। বৈধভাবে ইটভাটাগুলোর লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটভাটা মালিক ও ভাটা মালিক সমিতির দায়িত্বশীল পদে থাকা জনৈক নেতা বলেন, নিয়মনীতি মানা হলে সিংগাইর উপজেলার একটি ইটভাটাও লাইসেন্স পাবে না। আমরা যারা লাইসেন্স পেয়েছি তা মোটা অংকের টাকা আর তদবিরের জোরে।

সরেজমিনে জানা গেছে, চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর-মাধবপুর ও সোনাটেংরা গ্রামের সবুজ সমারোহ ফসলী জমিতে (চকে) গড়ে উঠেছে ১৭টি ইটভাটা। পুরো চক এখন ইটভাটার নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী চাষীরা অবৈধভাবে গড়ে উঠা এসব  ইটভাটার জন্য প্রভাবশালী ভাটা মালিক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদলকে দায়ী করলেন। মোল্লাহ ব্রিক্স-এর স্বত্তাধিকারী মোঃ মোশারফ মোল্লাহ নিজেদের ২টিসহ ওই চকে ১৭টি ইটভাটার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা শুরু করে মানুষকে এ  ব্যবসায়ের পথ দেখিয়েছি। তাতে অসুবিধার কিছু নেই। চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদল বলেন, আমিও চাই না এভাবে ইটভাটা গড়ে উঠুক। ইটভাটার ফলে ফসলি জমি নষ্টসহ পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে। কিছু মানুষের অনুরোধে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি ট্রেড-লাইসেন্স ও অনাপত্তি পত্র দিয়ে থাকি।সে ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতির কথা উল্লেখ থাকে।

ইটভাটার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে, উপজেলার বলধারা ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নের বিভিন্ন চকে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে ৩১ টি ইটভাটা। বলধারার পার্শ্ববর্তী বায়রা ইউনিয়নেও রয়েছে ১১ টি ইটভাটা। অনুরুপ জামসা ইউনিয়নে ৪টি, চারিগ্রামে ২টি, জয়মন্টপে ১টি, ধল্লা ইউনিয়নে নদী তীরবর্তী চর্চা দাগে ২টি, জামির্ত্তা  ইউনিয়নে ৬টি ও সদর ইউনিয়নে ২টি। এ ছাড়া প্রায় ডজেন খানেক ইটভাটা নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এসব ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না স্থানীয়  ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে জামির্ত্তা এলাকায় ইটভাটা প্রতিরোধ কমিটি হয়েছে। ওই কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এলাকাবাসি। তার পরেও থেমে নেই ফসলি জমির  মাটি বিক্রি। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও ইটভাটা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বলেন, আমাদের এ আন্দোলনে এলাকার জনগণ ব্যাপকভাবে সারা দিয়েছেন। আমরা এসব অবৈধ ভাটা বন্ধে প্রয়োজনে আগামীতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবো।

জামির্ত্তা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হালিম রাজু বলেন, আমি বুঝতে পারিনি আমার অনাপত্তি পত্রে গড়ে উঠা ইটভাটা এমন ভয়াবহ পরিস্থির সৃষ্টি করবে। বিশেষ কিছু ব্যক্তির অনুরোধে চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমতি দেয়া ভুল হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

এ দিকে হাইকোর্টের রুলসহ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বলধারা খোলাপাড়া এলাকায় নাম পরিবর্তন করে চলছে ২টি ইটভাটার কার্যক্রম। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন গত ২০ ডিসেম্বর ভ্রাম্যমান আদালতে ইটভাটা মালিক আমিনূর মেম্বারকে জরিমানা করেন। কিন্তু অবৈধ এ ভাটা বন্ধে নেয়া হয়নি কোন আইনগত ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা সময় মালিক পক্ষের হামলায় ৪ কৃষক আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, মালিক পক্ষের ভয়ে ওই এলাকার কৃষকরা তাদের জমিতে যেতে পারছেন না। মামলা করেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছেন তারা।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুরুতে ইটভাটা মালিকরা সহজ-সরল কৃষকদের লোভ দেখিয়ে বছরের ফসল উৎপাদনের দি¦গুন লাভ দিয়ে চাষাবাদযোগ্য ৩ ফসলি  জমি ২-৩ বছরের জন্য ভাড়া নেয়। তার পর তারা মোটা অংকের টাকা দিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স ও অনাপত্তি পত্র নিয়ে ওই  জমিতে ভাটার কাযক্রম শুরু করেন। আশ-পাশের জমির মালিকদের লোভ-লালসা এমনকি হুমকি -ধমকি দিয়ে জমির মাটি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে তদবির ও মোটা অংকের টাকা দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাগিয়ে নেন। সর্বশেষ  জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স পেতেও খরচ করেন মোটা অংকের টাকা। সূত্র মতে, এ উপজেলায় গড়ে উঠা ৭৫ টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে পেশীশক্তি ও টাকার জোরে।সরকারি নিয়মনীতিকে করা হয়েছে থোরাই কেয়ার। সূত্র আরো জানায়, এসব অবৈধ ইটভাটার মালিকরা একটি লাইসেন্সের বিপরীতে ৩-৪টি ভাটা স্থাপন করে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছেন। সরকার হারাচ্ছেন বিপুল রাজস্ব থেকে। কমে যাচ্ছে চাষাবাদ যোগ্য। দেখা দিয়েছে খাদ্যঘাটতির আশংকা।

এদিকে ইটভাটা মালিকদের ব্যবহৃত যানবাহনে সম্পদসহ প্রাণ হানির ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু মাত্র নূরু কোম্পনীর মালিকানাধীন এবিসি ইটভাটার  ট্রাক – ট্রলির চাপায় গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ১০ জন লোকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া কুদ্দুস কোম্পনীর মালিকনাধীন এএবি ও আলী আকবর কোম্পনীর মালিকানাধীন কেবিসির ইটভাটার ট্রলির চাপায় একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। মালিকপক্ষের প্রভাবে স্বজন হারিয়েও আইনি প্রতিকার পায়নি নিহতের পরিবারগুলো। ইটভাটায় নিয়োজিত ট্রাক, ট্রলি চলাচলের কারণে অধিকাংশ সড়ক ভগ্নদশা হয়ে ধূলায় ধূসরিত। পাশাপাশি এসব ভাটাগুলোতে প্রতিদিন শত শত টন কয়লা পোড়ানোর ফলে বিরুপ প্রভাব পড়ছে ফসল, গাছপালাসহ পরিবেশের উপর। পানি নিস্কাশনের খালগুলো ইটভাটা মালিকরা দখল করে ইচ্ছামত ব্যবহার করছে। ফলে পানি প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটছে। অপরদিকে, ইটভাটার প্রধান কাঁচামাল মাটির জোগান দিতে গিয়ে শত শত বিঘা ফসলি জমি জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫-৭ বছরে ফসল খ্যাত উর্বর সিংগাইর উপজেলা ঢাকা সংলগ্ন আমিনবাজার-বলিয়ারপুর চকের মতো ইটভাটার নগরীতে পরিণত হবে বলে বিজ্ঞ মহল মনে করেন।

এ ব্যাপারে সিংগাইর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও জয়মন্টপ ইউপি চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শাহাদৎ হোসেনের সাথে তার মোবাইল ফোনে একাধিক কল করেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি। সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা অবৈধ ভাটা গুলো ভেঙ্গে ফেলার দাবী জানাই। তবে প্রক্রিয়াধীন ইটভাটাগুলোর নিয়ম অনুয়াযী সুযোগ দেয়া হোক।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ টিপু সুলতান সপন বলেন, ইটভাটায় ফসলি জমির টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে । ফলে জমির উর্বরতা হারাচ্ছে  এ জন্য আমি প্রত্যায়ন পত্র দিচ্ছি না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোঃ সেকেন্দার আলী মোল্লাহ্ বলেন, যত্রতত্র গড়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ইটভাটা জনস্বাস্থ্যেও জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ সংক্রান্তে আমি দু‘টি চিঠি পেয়েছি আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক নাজমুছ সাদাত সেলিম বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সেই সাথে তিনি সিংগাইর উপজেলায় গড়ে উঠা ইটভাটার পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিয়ে সহযোগিতা করার কথা বলেন এবং অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ভাটাগুলো ভেঙ্গে ফেলার আশ্বাস দেন।