মিয়ানমারে ফেরার আশাতেই নো-ম্যানস ল্যান্ডে রোহিঙ্গারা

কক্সবাজার সংবাদদাতা : মিয়ানমারে নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার আশাতেই বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন রোহিঙ্গারা। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের কোনও না কোনও সময়ে নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকেও তাড়িয়ে দেবে এই শঙ্কায় আগে থেকেই কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জায়গা পাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছেন তারা। এরইমধ্যে সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের সেনারা রাতের আঁধারে নো-ম্যানস ল্যান্ডে প্রবেশ করে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার চেষ্টা করেছে বলেও সেখানে অবস্থানকারীরা অভিযোগ করেছেন। নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সেখানে অবস্থান করা প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে রাতের আঁধারে পালিয়ে তিন হাজার রোহিঙ্গা এরইমধ্যে অবস্থান নিয়েছে কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে। তবে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আশাতেই তারা তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের ঘরগুলোও অক্ষত রেখেছেন। অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা বলছেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে প্রথমে তারা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন। অবস্থান নেওয়ার এক মাসের মধ্যে স্বজনদের মাধ্যমে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজেদের নামে আশ্রয় শিবির বরাদ্দ নেন। বরাদ্দ নেওয়া এসব ক্যাম্পগুলোতে দু’য়েকদিন পরপর অবস্থান করলেও বেশিরভাগ সময় নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাস করছিল কিছু রোহিঙ্গারা। তাদের অধিকাংশের বাড়িই সীমান্ত এলাকায়।’ কিন্তু গত ৯ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো’র ঘোষণার পর থেকেই মূলত তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড ছেড়ে পালাতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে ২০ ফেব্রুয়ারি রাখাইনের ঢেঁকিবনিয়ায় দুই দেশের বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ে বৈঠক এবং ১ মার্চ মিয়ানমার সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠার পর রাতের আঁধারে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। এর মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। তবে অনেকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে গত প্রায় ছয় মাস ধরে নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাস করছে। এক সপ্তাহ আগে নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে পালিয়ে বালুখালীতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা যুবক ইমাম বলেন, ‘আমি জানি কোনও না কোনও সময়ে নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আমাদের সরিয়ে দেবে। এজন্য আগে থেকেই বালুখালীতে একটি জায়গা করে নিয়েছিলাম। সেখানে আমার মা ও সন্তানদের রেখে আমি ও আমার স্ত্রী নো-ম্যানস ল্যান্ডে ছিলাম। এখন নো-ম্যানস ল্যান্ড অশান্ত হয়ে যাওয়ায় আমার স্ত্রীকে নিয়ে বালুখালীতে চলে এসেছি। তবে নো-ম্যানস ল্যান্ডে এখনও আমার ঘরটি রয়ে গেছে। সপ্তাহে একবার গিয়ে ঘরটি দেখে আসি।’ নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানকারী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কুমারখালী গ্রামের নুরুল আলমের স্ত্রী সাজেদা বেগম (৩৫) শুক্রবার জানান, দুই দিন আগে নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে রাতের অন্ধকারে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পালিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘নো-ম্যানস ল্যান্ডে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে আমার ঝুপড়ি ঘরটির অবস্থান ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা রাতে পাথর ছুড়ে আমার ঘরের ত্রিপল নষ্ট করে দিয়েছে। এ কারণে আমি পালিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছি। আগে থেকেই কুতুপালং এই আশ্রয় শিবিরের ঘরটি তৈরি করেছিল আমার স্বামী। এখন স্বামী নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকে আর আমি সন্তানদের নিয়ে কুতুপালং ক্যাম্পে থাকি।’ নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে কুতুপালং ক্যাম্পে পালিয়ে আসা আরেক রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘সবাই যখন পালিয়ে আসছে আমরা কেন নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকবো? সেখানে তো আমাদের নিরাপত্তা নেই। আমি আগে থেকে অনুমান করেছিলাম যে নো-ম্যানস ল্যান্ড আমাদের জন্য নিরাপদ হবে না এবং কোনও না কোনোসময়ে আমাদের নো-ম্যানস ল্যান্ড ছাড়তে হবে। তাই পাঁচ মাস আগেই এই কুতুপালং ক্যাম্পে আমার এক আত্মীয়ের সহায়তায় জায়গা করে রেখেছিলাম।’ প্রসঙ্গত, গত ৯ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো মাইকিং করে ঘোষণা করেন, ‘নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভূমির মালিক মিয়ানমার। তাই রোহিঙ্গাদের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করা আইনত অবৈধ। দ্রুত নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে সরে না গেলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।’ এরপর গত ২০ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের রাখাইনের ঢেঁকিবনিয়া বিজিপি ক্যাম্পে বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে মিয়ানমার সরকার গত ১ মার্চ তমব্রু সীমান্তের কাছাকাছি অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে।