ঢাকায় মশার জ্বালা

‘কী আর বলব, ইদানীং দিনের বেলায়ও মশারি টাঙিয়ে বাসায় থাকতে হয়। কয়েল, অ্যারোসল, মশা মারার ইলেকট্রিক ব্যাট কিছুতেই কাজ হয় না। অন্য সময়ের চেয়ে মশার উপদ্রব খুব বেড়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা জাকারিয়া।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকার মধ্যবাড্ডায় বাসবাস করছেন শামসুল ইসলাম তুহিন। একজন চাকরিপ্রত্যাশী হওয়ায় তিনি সারাদিন মেসে থেকেই পড়ালেখা করেন। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে মশারি কিনেছি, এখন দিন-রাত সবসময়ই বাসায় মশারি টাঙানো থাকে আর এর মধ্যেই পড়ালেখা করি, মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। রাজধানীর মুগদা এলাকার রঞ্জন সরকার মশায় অতিষ্ঠ হয়ে বলেন, সারাদিন কাজ সেড়ে বাসায় ফিরে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ থাকতে হয়। মশারি জাগিয়ে ভেতরে ঢুকলে বা বাইর হতে গেলেও মশা ঢুকে যায়। বাসায় আছে ছোট বাচ্চা তাই সবসময় কয়েল বা অ্যারোসলও ব্যবহার করা যায় না। যে কারণে মশা নিয়ে খুব বিপদে আছি। সিটি কর্পোরেশন কী করে কিছুই বুঝি না। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বদ্ধভাবে থাকতে হয়।

শুধু জাকারিয়া, তুহিন আর রঞ্জন সরকার নন মশার এমন জ্বালা-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীতে বসবাস করা অধিকাংশ মানুষ। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাসা-বাড়ি, অফিস, খেলার মাঠ সর্বত্রই মশা আর মশা।

মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজধানীবাসী। তারা বলছেন, প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুবেলা মশা নিধনে বিষাক্ত কীটনাশক ছিটানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। মশক নিধনকারী কর্মীদের দেখা পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে দুই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ছাদের বাগান, ভবনের চৌবাচ্চা, এসি-ফ্রিজ থেকে জমা পানিতে মশার বংশ বিস্তার বেশি ঘটে। এসব স্থানে মশক নিধনকর্মীরা যেতে পারেন না। এছাড়া অন্য সব জায়গায় ওষুধ ছিটানোর ব্যাপারে শ্রমিকরা সঠিকভাবেই কাজ করছেন। আর ইদানীং মশার উপদ্রব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সে কারণে খুব শিগগিরই মশা নিধনে আরও পদক্ষেপ নেয়া হবে।

দুই সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) চলতি অর্থবছরে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়। আর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মশক নিধনে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ডিএসসিসিতে মশার ওষুধ ছিটানোর ৯৪০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে হস্তচালিত, ফগার ও হুইল ব্যারো মেশিন কিন্তু অর্ধেক মেশিনই প্রায় অচল রয়েছে। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে হস্তচালিত, ফগার, হুইল ব্যারো, ভ্যাহিক্যাল মাউন্টেড ফগার মেশিন মিলিয়ে মশা নিধনের মেশিন রয়েছে ৬৫৩টি। এর মধ্যেও প্রায় অর্ধেক নষ্ট। সব মিলিয়ে রাজধানীর মশা নিধনে অনেকটাই হিমশিম খাচ্ছে দুই সিটি কর্পোরেশন।

মশা নিধন সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান  বলেন, মশা নিধনের জন্য আমাদের ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে। আমরা মশা নিধনের জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। এছাড়া কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। মশা নিধনের ওষুধ-মেশিন সরবরাহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে। একই সঙ্গে মশক নিধনবিষয়ক পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন সোসাইটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আশা করি মশার উপদ্রব কমানো সম্ভব হবে।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এস এম মামুন জানান, মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় এবার জনসাধারণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে ডিএনসিসি একটি হটলাইন চালু করেছে। হটলাইন নম্বরটি হচ্ছে ০১৯৩২-৬৬৫৫৪৪। ডিএনসিসির আওতাধীন যে কোনো এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এ সেবা চালু হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই নম্বরে যে কেউ কল করতে পারবেন। এ নম্বরে ফোন দিলে মশক নিধনকর্মী পৌঁছে যাবে আপনার এলাকায়। ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই স্থানে মশার ওষুধ ছিটাবে।

এদিকে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালাহউদ্দিন আহমেদ  বলেন, চলতি বছর মশা নিধনের জন্য গত বছরের তুলনায় বেশি বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মূলত কাউন্সিলররা সুপারভাইজারের দায়িত্বে আছেন। তাদের কাছে ওষুধ পাঠানো হয়। তারাও নিয়মিত মনিটরিং করছেন। প্রতিদিন ১৮শ’ লিটার মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এছাড়া এ বছর থেকে নতুন টেলিফোস নামক লার্বি সাইডিং ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। আর বুধবার থেকে ডিএসসিসি এলাকায় মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হবে।