অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে ছাড় দেবে বিএনপি জোট!

স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে জোটগত দাবি-দাওয়া পূরণের ক্ষেত্রে ‘ন্যূনতম’ অবস্থানে যাবে বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় এবং সাংগঠনিক বাস্তবতার নিরিখে এই অবস্থান গ্রহণ করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে বিএনপি-জোটের। বিশেষ করে নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা ও প্রশাসনিক চাপ থাকায় কঠোর আন্দোলনের সম্ভাবনাকে প্রায় খারিজ করে দিচ্ছেন জোটের কোনও কোনও নেতা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা মনে করছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্বাচনের দাবি আদায়ে সরকারের বিরুদ্ধে ‘কঠোর কোনও আন্দোলন’ করার যৌক্তিকতা এবং সাংগঠনিক বাস্তবতা এখন নেই। বিশেষ করে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় তার মুক্তি নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীনদের ‘সমঝোতায়’ আসতে হবে বলে মনে করেন বিএনপি-জোটের অনেক শরিক নেতা। বিএনপি-জোটনেতাদের কারও কারও ধারণা, আগামীকাল রবিবার খালেদা জিয়া জামিন পেলেও আরও একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় সেসব মামলায়ও তাকে গ্রেফতার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানোর শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবার, জামিনে বেরিয়ে এলেও নিয়মিত কোর্টে যাতায়াত করতে হবে তাকে। বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়ার আদালতযাত্রা অব্যাহত থাকলে প্রচারণায় স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়বে বিএনপি-জোট। আর এই শঙ্কা থেকেই বিএনপির সামনে উঠে আসছে একটি শর্ত। সেটি হচ্ছে, খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাকি নিরপেক্ষ সরকারের দাবি পূরণ?

জোটের শরিক একটি দলের শীর্ষনেতা মনে করছেন, ‘জিয়া পরিবার কোন জায়গায় ছাড় খুঁজছে, সেটি ঠিক করতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, আপাতত কঠোর কোনও আন্দোলনের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা বা সক্ষমতা বিএনপির নেই। বিশেষ করে খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর বিদেশি কোনও রাষ্ট্র থেকেই এখন পর্যন্ত কোনও ধরনের মতামত আসেনি। উল্টো জার্মান দূতাবাসের একজন বেসরকারি এক টেলিভিশনে এসে মন্তব্য করে গেলেন–কেন ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি!

শরিক দলটির ওই শীর্ষনেতার পর্যবেক্ষণ, রবিবার আপিলে যদি খালেদা জিয়ার জামিন না হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। আবার তারেক রহমানের ক্ষেত্রে মোটামুটি নিশ্চিত যে, নির্বাচনে তিনি নেই। আর এই অবস্থাটি স্পষ্ট হলেই বিএনপিতে হতাশা নেমে আসবে। তিনি আরও যুক্ত করেন, তারেক রহমান এও বলবেন না, মা জেলে থাকুক, তোমরা নির্বাচনে যাও। নির্বাচনে যেয়ে তাকে মুক্ত করব।

এই দলীয় প্রধানের প্রশ্ন, কোন ধরনের ছাড় পেলে নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি? তার এই প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয়েছিল জোটের আরেক সিনিয়র নেতা, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাকের কাছে। তার উত্তর, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে বিএনপি-জোট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আন্দোলনও চালিয়ে যাবে। ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবে না। যে ধরনের সরকারই হোক, ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ নেই।’ তবে খালেদা জিয়ার জামিনের ব্যাপারে আশাবাদী বিএনপির নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আশা প্রকাশ করছেন, রবিবার খালেদা জিয়ার জামিন হবে। ইতোমধ্যে আসন চূড়ান্ত বা আসন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা হলেও জোটের সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়ার সামনে নির্বাচন বা আসন নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি এখনও। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে এ বিষয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি। বরং সর্বশেষ বৈঠকে জোটের একজন নির্বাচন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি মির্জা ফখরুলের কাছে জানতে চান, কী নিয়ে বলা হচ্ছে; আপনারা কি কোনও তালিকা করছেন? উত্তরে মির্জা ফখরুল জোটের শরিক নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা গণমাধ্যমের তথ্য কেন বিশ্বাস করেন। অনেক আলোচনা করা হয়, যা মূলত গসিপ।’

জোটের আরেকটি শরিক দলের নেতার ভাষ্য, নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা জোটে মূলত খালেদা জিয়াই থামিয়ে রেখেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী সূত্র বলছে, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দাবি পূরণ হলেই ভোটে যাবে বিএনপি। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা থাকলেও ‘উপ-প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে অরাজনৈতিক কাউকে নিয়োগের প্রস্তাব করতে পারে দলটি। আর ন্যূনতম শর্ত হিসেবে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও মানুষের অবাধ অংশগ্রহণকেই সামনে রাখার চিন্তা-ভাবনা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তবে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের দাবির বিষয়টি আগামী দিনেও সামনেই রাখবে বিএনপি। এ বিষয়ে জমির উদ্দিন সরকারের ভাষ্য, ‘এখনও নির্বাচন ও এর কৌশল নিয়ে বলার সময় আসেনি।’

বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি যতবারই নির্বাচন করেছে-১৯৯৫ সালে, ২০০৬ সালেও নির্বাচনের আগেই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এক-এগারোর সরকারের সময়ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সে নির্বাচন বয়কট করে দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। বিএনপির অভিযোগ ছিল, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সে নির্বাচনে ১৫৪ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের শরিক একটি দলের প্রধান নেতা বলেন, বিএনপি-জোটের আন্দোলনের বাস্তবতা মোটেই নেই। সরকারকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে। তাদের ওপরও চাপ আছে। ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তির কোনও সুযোগ থাকবে না। অংশগ্রহণকে দৃশ্যমান করতে হবে। বিএনপি-জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, ‘আশা করি, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে যাবে। জোটবদ্ধভাবেই যাবে। কয়েকটা জায়গা চিহ্নিত করেছি। আমরা বিস্তারিত পরে বলতে পারবো।’ শুক্রবার রাতে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যরিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির পরই আমরা নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে বসব। আর নির্বাচনে বিএনপির দাবি কী, এগুলো নিয়ে প্রস্তাব দেবেন খালেদা জিয়া। তখনই বলা যাবে, কী কী শর্তে নির্বাচনে যাবে বিএনপি।’ যদিও গত ৩ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কয়েকটি দাবি উলে¬খ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করা, সেনা মোতায়েন করা, সব মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা ইত্যাদি। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় সমাপনী বক্তব্যে মির্জা ফখরুলও জানান, বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। তবে সেই নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হতে হবে এবং সবার সমান সুযোগ থাকতে হবে। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টিও উলে¬খ করা হয়েছিল নির্বাহী কমিটির রাজনৈতিক প্রস্তাবে। বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার শর্তেই বাকি দাবিগুলোতে নমনীয় হবে দলটি। বিএনপি বা জোটের ছাড় দেওয়া-না দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করার এখনই সময় আসেনি বলে মন্তব্য করেন জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য নির্দলীয় সরকার দরকার। এটি বিচারপতি খায়রুল হকের জাজমেন্টেও ছিল। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসের যে গ্যাপ রয়েছে, তাতে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’  তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, সঠিক সময়ে সরকারের সঠিক বুদ্ধি উদয় হবে। সবার জন্য কনক্রিট কিছু নিয়ে আসবে।’ বিজেপির চেয়ারম্যানের মতো এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রেখেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। সম্প্রতি তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো এত বড়, ঐতিহ্যবাহী, পুরনো রাজনৈতিক দল; তাদের যে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, তাকে সামনে রেখে দে উইল কামব্যাক টু দেয়ার সেন্সেস। তারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য, জাতির জন্য একটা পথ খুঁজে বের করবেন। আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সহনশীলতার রাজনীতি করে তারা একটা সুন্দর ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন, এটাই আমরা আশা করি।’