ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, নাকি গুজব

ঋণ আমানতের (এডিআর) অনুপাত কমানোকে কেন্দ্র করে তারল্য সংকটের কথা বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে এখনও অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে ৯৭ হাজার ১২২ কোটি টাকা ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কাছেই রয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, সরকারি ব্যাংকগুলোর কাছেও পর্যাপ্ত টাকা পড়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরও বলেছেন, ব্যাংক খাতে কোনও তারল্য সংকট নেই। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসা সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন। ফজলে কবির বলেন, ‘ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) নিয়ে ব্যাংক খাতে অহেতুক প্যানিক দেখা দিয়েছে।’ অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘একটি বেসরকারি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে নিতে চাইছে। এ কারণে ব্যাংক খাতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে বেসরকারি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান  বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো আমিও বলবো, ব্যাংক খাতে কোনও তারল্য সংকট নেই।’   বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। এক বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ১২২ কোটি টাকা।   অবশ্য হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করায় তাদের নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক। যদিও ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার কারণে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।  এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম মজুমদার  বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংকের খারাপ অবস্থার প্রেক্ষিতে সরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। এর ফলে কিছু ব্যাংক নগদ টাকার সংকটে পড়েছে। কিন্তু বাকি ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকসহ সরকারি ব্যাংকগুলোতে কোটি কোটি টাকা পড়ে রয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘ব্যাংক খাতের কোথাও তারল্য সংকট নেই। যেটা হচ্ছে সেটা গুজব। তবে এই গুজবটা হয়েছে মূলত ঋণ আমানতের অনুপাত কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে।’  বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা ঋণ দিতে পারবে। আগে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারতো। আর ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারবে সর্বোচ্চ ৮৯ টাকা পর্যন্ত। ইসলামি ব্যাংকগুলো আগে দিতে পারতো ৯০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ নতুন নীতিমালার কারণে সাধারণ ব্যাংক আগের চেয়ে দেড় টাকা এবং ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো এক টাকা কম ঋণ বিতরণ করতে পারবে।  অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ১০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে ঢুকে পড়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে।   এছাড়া, সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তিনটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তুলে সরকারি ব্যাংকে জমা করেছে। এতে বেকায়দায় পড়েছে বেসরকারি খাতের ওই তিনটি ব্যাংক।  এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম  বলেন, ‘অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করায় গুটিকয়েক ব্যাংকে হয়তো নগদ টাকার সংকট হতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট হওয়ার কথা নয়। কারণ, কয়েকদিন আগেও অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে ব্যাংকগুলো অস্বস্তিতে ছিল। এখন সেটা হয়তো স্বাভাবিক পর্যায়েই রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর কারণে কিছুটা সংকট হলেও হতে পারে। সেটার প্রভাব পড়েছে ঋণ আমানত অনুপাত কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে। এছাড়া, আমদানি বেড়ে যাওয়া এবং টাকার তুলনায় ডলারের তেজি অবস্থা এই সংকটকে হয়তো কিছুটা প্রভাবিত করেছে। তবে এই তারল্য সংকট খুবই সাময়িক।’   কোনও কোনও ব্যাংক এই নির্দেশনা মানতে গিয়ে বিপাকে পড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, সরকারি ব্যাংকগুলোতে এখনও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত  সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক  থেকে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মেয়াদি আমানত নিয়েছে। এর বাইরে সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড কিনেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান  দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক ।   জানা গেছে, সোনালী ব্যাংক ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমানত সংগ্রহ করেছে এক লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে মাত্র ৪২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। ফলে এই ব্যাংকটিতে পড়ে রয়েছে ৬৪ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য পড়ে থাকা এই টাকার বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করে রেখেছে ব্যাংকটি।   এছাড়া, অগ্রণী ব্যাংক ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমানত সংগ্রহ করেছে ৫৩ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে মাত্র ৩১ হাজার ৯১১ কোটি টাকার ঋণ। ফলে ব্যাংকটিতে পড়ে রয়েছে  প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। আবার রূপালী ব্যাংকে আমানত জমেছে ৩২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।