ফেব্রুয়ারিতে ঝকঝকে, সারাবছর অবহেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

ফেব্রুয়ারি মাসকে বলা হয় ভাষার মাস। ১৯৫২ সালের এ মাসে ভাষার জন্য জীবন দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন যারা, তাঁদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে এই শহীদ মিনার ৷ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে অবস্থিত এই শহীদ মিনার ও ভাষা শহীদদের নিয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ গর্ববোধ করেন, প্রতিবছর রচিত হয় অসংখ্য গান-কবিতা-সাহিত্য। কিন্তু, বাস্তবে সারাবছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে এই স্মৃতির মিনার। কেবল ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এখানে চলে মৌসুমী পরিচ্ছন্নতার অভিযান ।   সরেজমিনে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে পরিষ্কার অভিযান, শেষ মুহূর্তের ঘষা-মাজা,অথচ ফেব্রুয়ারি গেলেই এই শহীদ মিনার যেন পড়ে থাকে অনাদর, অবহেলায়। সারাবছরই দেখা যায় দর্শনার্থী ও বিশ্রামকাঙ্ক্ষীদের দ্বারা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মর্যাদা। অনেকে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে উঠে পড়েন,যেভাবে ইচ্ছা ঘুরে বেড়ান, সেলফি তোলেন ৷ পায়ে জুতো নিয়েও অনেককে শহীদ মিনারের বেদিতে উঠে পড়তে দেখা যায় ৷ আবার কাউকে কাউকে পরিবার নিয়ে মিনারের পাদদেশে বসে থাকতে দেখা যায় ৷ যেন শহীদ মিনার অবসর সময় কাটানোর স্থান!  এছাড়াও বছরজুড়েই মিনারের চারপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। বছরজুড়ে মিনারের পাদদেশে পাখির মল পড়ে সাদা হয়ে যায়। সিঁড়ির ওপর গাড়ি, মোটর সাইকেল পার্ক করে রাখা হয়।  শহীদ মিনার চত্বরের ভেতরে অনেকে প্রকাশ্যে ধূমপান করে, বাদামের খোসাসহ নানা ধরনের খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলা হয়। পথচারীরা পথ সংক্ষেপের জন্য মিনারের পাদদেশকে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে। দিনে বা রাতে এই শহীদ মিনারে রাত যাপন করছে ভবঘুরেরা। কিন্তু, এসব অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা রোধে তেমন কোনও কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেয় না এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।  অমর একুশে উপলক্ষে ১১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় শহীদ মিনার ধোয়া-মোছার প্রস্তুতি। সারা বছর শহীদ মিনার থাকে অবহেলায়।  এদিকে সংবিধানের ১০২ নং অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় শহীদ মিনারের আশেপাশে ভবঘুরেদের অবস্থান,অসামাজিক কার্যকলাপ,মিটিং মিছিল ও পদচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং শহীদ মিনারের একপাশে এসব নিয়ম কানুন সম্বলিত নোটিশ বোর্ড আছে। তবে সেদিকে কারও নজর নেই।  শহীদ মিনারের সামগ্রিক বিষয়গুলো দেখভালের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী ও ৩ জন পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দিলেও স্থানীয়দের অভিযোগ শহীদ মিনারে দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের দেখামেলে কালেভাদ্রেই। একাধিকবার সরেজমিনে গিয়েও শহীদ মিনার এলাকায় তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।  এছাড়াও হাইকোর্টের নির্দেশনা বড় করে লেখা থাকলেও সেদিকে যেমন মনোযোগ থাকে না ঢাবি কর্তৃপক্ষের, একইসঙ্গে এ নির্দেশনার তোয়াক্কা করছে না শহীদ মিনারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরাও ৷   এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বডুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘অনেক ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা ভঙ্গ করা হয় ৷ মূলবেদিতে জুতা নিয়ে ওঠা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে সেটা মেনে চলছে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশের শহীদ মিনারের মর্যাদা একটু আলাদা ৷ এ মর্যাদা যদি রক্ষা করা না হয়,তাহলে শহীদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হবে না ৷ এছাড়াও শহীদ মিনারের নিরাপত্তার জন্য তিনজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৷ কিন্তু শহীদ মিনারে গেলে তাদের দেখা মেলে না। এ শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত ৷”  এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভাষা সৈনিক আবদুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শহীদ মিনারে গেলে দেখি আবর্জনায় ভরপুর ৷ এটিকে সঠিক মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না ৷ সারা বছর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অযত্ন-অবহেলায় থাকে ৷ শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি এলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে ৷ এখন মানুষের মধ্যে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও কমে গেছে ৷ আমাদের খবর কেউ নেয় না ৷ ”   শহীদ মিনারে ডিএমপি কমিশনার শহীদ মিনারে ডিএমপি কমিশনার  এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো.আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শহীদ মিনার এলাকাতে সবার সাবধানতা অবলম্বন করে চলা উচিত ৷ মিনার এলাকায় জনসাধারণের চলাফেরার সতর্কতার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিনারের এলাকায় একটি নির্দেশনা দিয়েছে ৷ এরপরও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের সঙ্গে আমরাও দায়িত্ব পালনে কাজ করে যাচ্ছি ৷ সবার যৌথ উদ্যোগে মিনার এলাকাকে নিরাপদ রাখতে হবে ৷”