২০ দলীয় জোটের গোপনে বিলোপে মন ভেঙেছে শরিকদের

32

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়েই বিএনপির ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেয়ার বিষয়টি ভালো হয়নি বলে মনে করে এর সাবেক শরিকরা। তারা মনে করে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেই সেটি ভদ্রস্থ হতো।

বিলুপ্ত জোটের ১২ শরিক গড়ে তুলেছেন নতুন জোট। এর ঘোষণা দিতে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে আসেন নেতারা, যারা এতদিন তারা ২০ দলীয় জোট অঁটুট আছে বলে দাবি করে আসছিলেন।

এই সংবাদ সম্মেলনেই প্রকাশ পায় ঘোষণা না দিয়ে বিএনপির ২০ দল ভেঙে দেয়ায় তাদের আক্ষেপের কথা। এও প্রকাশ পায়, এতদিন প্রকাশ না করলেও গত ৯ ডিসেম্বরই তারা বুঝতে পারেন জোট আর নেই।

২০ দলের সাবেক শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নে বলেন, ‘যদিও আনুষ্ঠানিক প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ ২০ দলীয় জোটের জন্ম হয়েছিল, তবে জোটের বিভক্তিটা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি, অনানুষ্ঠানিকভাবে হয়েছে।’

এর আগে ইবরাহিম বলেন, ‘এখন থেকে বলবেন ১২ দলীয় জোট, ২০ দলীয় জোট না।’

বিএনপির জোট ভাঙা যেভাবে জানল শরিকরা

পরে তিনি জানালেন, ২০ দলীয় জোট যে আর সেই, সেটি তারা জেনেছেন গত ৯ ডিসেম্বর। যদিও ১৫ ডিসেম্বর এক প্রশ্নে তা স্বীকার করেননি ইবরাহিম।

কল্যাণপার্টির নেতা জানান, ডিসেম্বরের ৯ তারিখ বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ডাকে বিএনপি। সেখানেই সব বুঝতে পারেন তারা।
ইবরাহিম বলেন, “১০ তারিখের ব্যাপারে পরামর্শ সভা ছিল। সেখানে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতৃবর্গ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বলেন, ‘এখন থেকে ২০ দলীয় জোট নামটি আর ব্যবহার করবেন না। তবে আপনারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একসঙ্গে চলতে পারেন।’

“এইরূপ বক্তব্যের পর ২০ দলীয় জোটের অস্তিত্ব আর থাকে না। যদিও…বিএনপির মহাসচিব এর আগেও বলেছিলেন ২০ দলীয় জোট আর নাই।”
২০ দলীয় জোট ভাঙার আগে বিএনপি গত নির্বাচনে গড়ে তোলা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও কার্যত বিলোপ করে দেয়। তবে সেখানেও দেয়া হয়নি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তবে শরিকরা জানেন বাস্তবতা। সেই শরিকদের মধ্যে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন নতুন জোট গণতন্ত্র মঞ্চ। এই মঞ্চও বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে একমত।

জোট ভাঙার ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট, বিশ্বাস হয়নি শরিকদের

১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট গঠন করা হয়, প্রথমে সেটি ছিল চারদলীয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি, গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী এবং আজিজুল হকের নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে মাঠে নামে বিএনপি।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদ জোট ছেড়ে চলে গেলেও তার দলের একাংশ বিজেপি নামে দল গঠন করে জোটে থেকে যায়।

এরপর ধীরে ধীরে জোটের দল বেড়ে হয় ১৭, পরে হয় ২০। এখন তা ২০-দলীয় জোট নামেই পরিচিত। এরপর ২০১৮ সালে বিএনপি গড়ে তোলে আরও একটি জোট, নির্বাচনে যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেও।

একই সঙ্গে দুটি জোটের অভিনবত্ব কাজে না আসার পর ভোট শেষে ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যায় দুটিই। আর চার বছরের মধ্যে ঘোষণা না দিয়েই জোট থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত জানায় বিএনপি।

চার থেকে পাঁচটি দল জোট থেকে ঘোষণা নিয়ে বের হয়ে আসার পর সেই দলগুলোর কয়েকজন নেতা একই নামে আলাদা দল গঠন করে ২০ দলে থেকে যাওয়ায় বিএনপির জোটের নাম ২০ দলই থেকে যায়। তবে সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছে, সেটি আসতে থাকে গণমাধ্যমে।

এর মধ্যে সাড়ে তিন মাস আগে বোমা ফাটান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। গত ২৭ আগস্ট দলের কুমিল্লার একটি ইউনিটের রুকন সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি জানান, বিএনপির সঙ্গে জোটে আর নেই তারা।

সেদিন তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন একটা জোটের সঙ্গে ছিলাম। আপনারা ছিলাম শুনে হয়তো ভাবছেন কী হয়েছে এখন। হ্যাঁ, হয়ে গেছে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই জোট দেশের জন্য উপকারী একটা জোট ছিল। ৬ সালের ২৮ অক্টোবর এই জোট তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এবং সেদিন বাংলাদেশ পথ হারিয়েছে। তার পরে আর ফিরে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বহু চিন্তা করে দেখেছি, এর পর থেকে এই জোট বাংলাদেশের জন্য আর উপকারী জোট নয়।’
তবে স্বীকার করছিল না বিএনপি। একের পর এক প্রশ্নে মুখ খুলছিলেন না মির্জা ফখরুল। এমনও বলেন, এ নিয়ে কথা বলতে না চাওয়া তার গণতান্ত্রিক অধিকার।

তবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ৮ ডিসেম্বর তিনি সংবাদ সম্মেলনে আসার পর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিনিধির এক প্রশ্নে জানান, তাদের জোট আর নেই। এখন হবে যুগপৎ আন্দোলন।

এক প্রশ্নে ফখরুল বলেন, ‘আমাদের কোনো জোট নেই। আমরা বলেছি, অন্য দলগুলো গণতন্ত্রের জন্য তাদের নিজস্ব কর্মসূচি পালন করবে। এসব কর্মসূচি পালিত হবে একই সঙ্গে, যাকে আমরা যুগপৎ বলে থাকি। সবাই নিজের পছন্দের এলাকা বা অফিসে কর্মসূচি পালন করবে।’

সমমনা যে দলগুলো তারা কি তাহলে ১০ ডিসেম্বর আলাদা আলাদা সমাবেশ করবে?- এমন প্রশ্ন রাখেন দেশের একটি গণমাধ্যমের কর্মী।

ফখরুল জবাব দেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনে মানেই এটা।’

এক সপ্তাহ আগেও উল্টো কথা

বিএনপির ১২ শরিক ২০ দলীয় জোট ভেঙে যাওয়ার কথা ৯ ডিসেম্বর জানার কথা স্বীকার করলেও এক সপ্তাহ আগেও তারা তা গণমাধ্যমে স্বীকার করেননি।

গত ১৫ ডিসেম্বর কথা বলেছে ২০ দলের ৮ শরিকের ৯ নেতার সঙ্গে। এদের মধ্যে কেবল কটি দলের একজন নেতা স্বীকার করেছেন জোট নেই। বাকি সাতটি দলের আটজন নেতা জানেন না কিছুই।
২০-দলীয় জোট না থাকার প্রসঙ্গে প্রশ্ন শুনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অলি আহমদ সেদিন করেন পাল্টা প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘জোট ভাঙার কথা কে বলেছে আপনাকে? মহাসচিবের (ফখরুল) এমন কোনো বক্তব্য আমি শুনিনি। ২০-দলীয় জোট এখনও আছে, আমরা সেই জোটে আছি। ইটস স্টিল অ্যাকটিভ।’

অলি অবশ্য ১২ দলীয় জোটে নেই।

১২ দলের শরিক মোস্তফা জামাল হায়দার সেদিন বলেন, ‘মহাসচিব (ফখরুল) এভাবে বলতে পারেন না। উনি হয়তো বলতে চেয়েছেন যে, জোটের অ্যাকটিভিটি এখন কম। তবে জোট না থাকার প্রশ্নই আসে না।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপার একাংশের চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমানও বলেন, ‘জোট তো আছেই। আমরা আগামী সপ্তাহে একটি প্রোগ্রাম করেছি, সেখানে জোটের নেতা-কর্মীরা অংশ নেবেন।’

লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘২০-দলীয় জোট ভাঙা কিছু নেই, এটা তো কখনই ভাঙবে না। তবে জোট এখন কার্যকর না। মহাসচিব ভাঙার কথা বলেননি, যুগপৎভাবে যার যার জায়গা থেকে আন্দোলন করতে বলছেন।’