সাত এমপির পদত্যাগ: সরকারের কৌশল কি?

55

 

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদ থেকে আজ রোববার বিএনপির সাত এমপি পদত্যাগ করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচজন সংসদ সদস্য পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছেন। বাকি দুইজন পরে জমা দেবেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সাত এমপির পদত্যাগের ফলে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হল এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হবে বলেই বিএনপি নেতারা বলছেন। তারা এটিও দাবি করছেন এর ফলে তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করা সহজ হবে। তবে বিএনপি পদত্যাগের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তাতে তারা বলেছে, তারা এই পদত্যাগে মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। বিএনপির সাত এমপির পদত্যাগে সংসদের কোনো ক্ষতি হবে না বলেও তারা বক্তৃতা দিয়ে জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ দুজনই বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, এর ফলে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম কোনো সমস্যা হবে না। আপাতদৃষ্টিতে এটি সত্যি যে সাতজন এমপি পদত্যাগ করলেন জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কি হবে সেটিও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এর ফলে জাতীয় সংসদে বিএনপি শূন্য হয়ে পড়ল এবং এটির রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক এবং কূটনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। সাত এমপির পদত্যাগের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কৌশল কি হবে সেটি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।

প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের নেতারা জাতীয় সংসদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না বললেও আওয়ামী লীগের মধ্যে পদত্যাগ এবং তার পরবর্তী কৌশল নিয়ে নানামুখী আলাপ-আলোচনা চলছে। এখন এই পদত্যাগের পর আওয়ামী লীগ কি করতে পারে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন আওয়ামী লীগের সামনে তিনটি পদ রয়েছে।

প্রথমত, আওয়ামী লীগের সরাসরিভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবে এবং শূন্য আসনে উপনির্বাচন দেবে এবং উপনির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নিবর্ংাচিত হবে। এই উপনির্বাচনগুলো আওয়ামী লীগের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। উপনির্বাচনগুলো অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ করবে। জয় পরাজয়ের বিষয় নিয়ে ভাববেন না এবং এ আসনগুলোর মধ্যে কয়েকটি আসন বিএনপির অধ্যুষিত। কাজেই সেই সমস্ত আসনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচন না করলেও স্বতন্ত্র হিসেবে বিএনপির কেউ কেউ দাঁড়াবে। এর ফলে বিএনপির মধ্যে একটি নির্বাচনমুখী প্রবণতাকে উস্কে দেওয়া সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকার এই পদত্যাগপত্রগুলো নিয়ে ধীরে চলো রীতিনীতি অনুসরণ করতে পারেন। এখন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। স্পিকার এখন এই পদত্যাগপত্রগুলো আলোচনা করবেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। তিনি একটি যৌক্তিক সময় পাবেন পদত্যাগপত্রগুলোকে যাচাই-বাছাই করা এবং এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ থেকেও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং সেই সময়ে স্পিকার এই পদত্যাগপত্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণে সময় ক্ষেপণ করেছিলেন। পরবর্তীতে এটি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে ছিল। কাজেই সরকার চাইলে এখানে কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। কারণ জাতীয় সংসদের মেয়াদ আছে মাত্র এক বছর। এই পদত্যাগপত্রগুলো যদি কিছুদিন ঝুলিয়ে রাখা যায়, তারপর নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় থাকবে আরও ৯০ দিন। অর্থাৎ তিন মাস। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনের সময়কাল চলে আসবে। সরকার একটি বিষয় বিবেচনা করে দেখছে মাত্র এক বছরের মধ্যে সাতটি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা আদৌ যোক্তিক হবে কিনা এবং গ্রহণযোগ্য হবে কিনা সে বিষয়টি। কাজেই এই সময় এই সময়টিকে অতিবাহিত করার কৌশল ইচ্ছে করলে সরকার নিতে পারে।

তৃতীয়ত, এই পদত্যাগপত্র প্রাপ্তির পর সরকার এ নিয়ে সংসদের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। এর মধ্যদিয়ে জাতীয় সংসদকে সঙ্ঘবদ্ধ করে এবং জাতীয় সংসদকে অর্থবহ করার একটি সুযোগ তৈরি হবে। সবগুলো বাকি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ করে একটি সংসদকে অর্থবহ এবং কার্যকর অব্যাহত রাখার একটি নীতি-কৌশল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে পারে। সেই প্রক্রিয়াতেও আওয়ামী লীগ যেতে পারে। সংসদ থেকে পদত্যাগের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টির একটি প্রচারণা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার এবং আওয়ামী লীগ কি করবে সেটাই হলো এখন দেখার বিষয়।