সাকরাইন উৎসবে ফানুস বিক্রি-ওড়ানো বন্ধে কঠোর হচ্ছে পুলিশ

22

আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-বঞ্চনার হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে রাজধানীবাসী মেতে ওঠে বাঁধভাঙা উল্লাসে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঢাকার আকাশে দেখা মেলে হাজার হাজার জ্বলন্ত ফানুসের। চারদিক কাঁপিয়ে ফোটে বাজি। আতশবাজির আলোয় ঝলমল হয় সর্বত্র। দূর আকাশে ফানুসের আলোক ঝলকা, বাজির শব্দ আর আলো সবাইকে জানান দেয় নতুন ইংরেজি বছর এসে গেছে।

২০২৩ সালের ইংরেজি নববর্ষের প্রথম প্রহর (৩১ ডিসেম্বর দিনগত রাত, ২০২২) উদযাপনেও রাজধানীতে ছিল আতশবাজি আর ফানুসের আলোক ঝলকা। তবে এই আলোর পেছনেও তৈরি হয় অনেক দুর্ঘটনার গল্প। ওই রাতে ওড়ানো ফানুস গিয়ে পড়ে মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক তার এবং রেললাইনে। ফলে ১ জানুয়ারি দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেল চলাচল।

বাংলা পৌষ মাসের শেষ ও মাঘ মাসের শুরুতে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসবের আয়োজন করে পুরান ঢাকাবাসী। দিনভর ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যায় বর্ণিল আতশবাজি আর রঙ-বেরঙের ফানুস উড়িয়ে সাকরাইন উৎসবকে উদযাপন করার রীতি অনেকদিনের। তবে আতশবাজি এবং ফানুস ওড়ানোর কারণে প্রতিবছরই এদিন ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় এবছর সাকরাইন উৎসবকে সামনে রেখে কঠোর হচ্ছে পুলিশ। সাকরাইন উৎসবে রাজধানীবাসী যাতে ফানুস ওড়াতে না পারে এবং দোকানিরা ফানুস বিক্রি করতে না পারেন- সে বিষয়ে পুলিশ বেশ তৎপর।

পুলিশ বলছে, এবার এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সাকরাইন উৎসব উদযাপনের কয়েক দিন আগে থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ এই রাতে সব ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য, আতশবাজি, পটকা ফোটানো বা ফানুস ওড়ানো বন্ধ করতে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীটি।

বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) সরেজমিনে পুরান ঢাকার একাধিক দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে ফানুস বিক্রি চলছে। এমনকি আগের চেয়ে দামও বেশি হাকাচ্ছেন দোকানিরা।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর যেসব এলাকায় ফানুস বিক্রি হয় গত কয়েক দিন ধরে সেসব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করেছে ডিএমপির বিভিন্ন থানা পুলিশ। বিক্রেতাদের গতবারের অগ্নিদুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফানুস বিক্রি না করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এছাড়া ডিএমপির সব থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ওই থানার আওতাধীন এলাকায় যেন ফানুস বিক্রি ও ওড়ানো না হয়। যদি কেউ ফানুস ওড়ায় বা আতশবাজি ফোটায় তাহলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে ডিএমপি।

ফায়ার সার্ভিস ও জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ সূত্রে জানা যায়, গতবার বর্ষবরণ রাতের প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যে সারাদেশ থেকে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে। পরবর্তীতে প্রাথমিক তদন্তে ফায়ার সার্ভিস জানতে পারে, এসব অগ্নিকাণ্ডের বেশিরভাগ ঘটে ফানুসের কারণে। কয়েকটির জন্য দায়ী ছিল আতশবাজি।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, ঢাকা শহরের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফানুস ওড়ালে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি থাকে। জ্বলন্ত ফানুসগুলো উড়ে কোথাও না কোথাও পড়ে। বাসাবাড়ির ছাদে নয়তো বস্তি এলাকার ঘরবাড়ির ওপর এগুলো পড়ে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিডিয়া সেল) মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, ফানুস ওড়ানো যাবে কি না, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা আছে। আমাদের লোকবলও সতর্ক থাকবে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে, আমরা আহ্বান জানাবো সবাই যেন একটু সতর্ক থাকেন, সচেতন থাকেন। ফানুসের কারণে যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনে ওড়ানো ফানুস মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক তারে পড়ায় গত ১ জানুয়ারি দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেল চলাচল। সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত উত্তরা উত্তর (দিয়াবাড়ী) স্টেশন থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এ সময়ে অপসারণ করা হয় মেট্রোরেলের ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার পথজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফানুস।

মেট্রোরেল চলাচল শুরু হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী মেলেনি। কারণ সকালে দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকায় অনেকেই স্টেশনে এসে ফিরে যান। অনেকেই মনে করেছেন মেট্রোরেল হয়তো বন্ধ। এ কারণে সকাল ১০টা থেকে মেট্রোরেল চলাচল শুরু হলেও অনেক আসন ফাঁকা রেখেই ট্রেনগুলো স্টেশন ছেড়ে যায়।

গত ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মেট্রোরেল ব্যবহারে জনসচেতনতা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন জানান, আপনারা জানেন গত ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেল উদ্বোধন হয়েছে। মেট্রোরেল নিয়ে মানুষের বিপুল আগ্রহের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন আমরা যেন মেট্রোরেল ব্যবহারে সচেতন হওয়ার বিষয়ে প্রচার করি। সার্বিক যত্ন নিয়ে যেন আমরা মেট্রোরেল ব্যবহার করি, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

জানতে চাইলে লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) জাফর হোসেন বলেন, রাজধানীতে ফানুস ওড়ানোর কারণে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ছিল। সাকরাইন উৎসবকে কেন্দ্র করে থানায় থানায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো দোকানে ফানুস বিক্রি করা যাবে না এবং ফানুস কেউ কিনতেও পারবে না। চকবাজারসহ পুরান ঢাকার দোকানগুলোতে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক নিবলেন, থানায় থানায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরান ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি বড় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের আমরা বুঝিয়েছি, কেউ যাতে ফানুস বিক্রি করতে না পারে।