ব্যাংকে দুই আনসার সদস্যের মৃত্যু: সিসিটিভি ক্যামেরায় যা দেখা গেল

32

পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের দুজনের শরীরে আঘাতের কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মুখে ফেনা ছিল। এ কারণে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের ধারণা, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁরা শেষ কোথায় কী খাবার খেয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ব্যাংকের কর্মকর্তা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই দুই আনসার সদস্যের দায়িত্ব ছিল প্রতি রাতে কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করে পাহারা দেওয়া। এর জন্যই তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তৌহিদুল ছয় মাস ও রঞ্জু চার মাস ধরে এখানে কাজ করছিলেন।

নিয়ম অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে একজন কার্যালয়টির ভেতরে হাঁটাহাঁটি করবেন, এ সময় অন্যজন বিশ্রাম নেবেন। এ জন্য ব্যাংকটির স্টোররুমে বিভিন্ন পুরোনো লেজার ও নথিপত্রের পাশেই একটি চৌকি ছিল। ওই দুই আনসার সদস্য ব্যাংকটির ভেতরের রান্নাঘরে নিজেরাই রান্না করে খেতেন।

ব্যাংকের ভেতরে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের বরাত দিয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্যাংকটির কর্মকর্তারা কাজ শেষে কর্মস্থল ত্যাগ করার পর ওই দুই আনসার সদস্য মূল দরজা ও কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ করে বাইরে যান। সন্ধ্যা সাতটার পর স্থানীয় বাজার থেকে আলু, মরিচসহ কাঁচাবাজারভর্তি একটি ব্যাগ নিয়ে পুনরায় তাঁরা ব্যাংকে ঢোকেন। এ সময় মূল গেটের কলাপসিবল ও দরজা তালাবদ্ধ করে ওই বাজারের ব্যাগ হাতে দুজনই রান্নাঘরে ঢোকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে বেরিয়ে কার্যালয়ের ভেতরেই রাত আনুমানিক আটটা পর্যন্ত দুজনকেই অস্থিরভাবে পায়চারি করতে ও সিগারেট খেতে দেখা যায়। পরে তাঁরা তাঁদের কক্ষে (স্টোররুম) ঢুকে যান।

পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ অনুযায়ী রাত আটটার পর তাঁরা আর ওই স্টোররুমের বাইরে বের হননি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই কক্ষে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ থাকা ওই কক্ষে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় পরে কী হয়েছে, তা জানা যায়নি।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী স্থানীয় এক নারী প্রতিদিন সকালে ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর আগে এসে আনসার সদস্যদের ডেকে তুলতেন। এরপর কার্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রান্না করেন। প্রতিদিন দুপুরে তাঁর রান্না করা খাবার খান ব্যাংকটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। প্রতিদিনের মতো গতকাল সকাল নয়টার দিকে ওই নারী এসে ডাকাডাকি করছিলেন। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছিলেন না। ব্যাংকটির কয়েক কর্মকর্তাও এসে ভেতর থেকে দরজা আটকানো দেখতে পান। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রায়পুরা থানার পুলিশকে খবর দেয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ব্যাংকের কার্যালয়ে এসে কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিশ্রামের জন্য ব্যবহৃত চৌকির ওপর থেকেই একজন শোয়া ও অন্যজন বসা অবস্থায় দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তখনো তাঁদের একজনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের ফ্লাশলাইট জ্বলে ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের মৃত্যুর সময় হয়তো বিদ্যুৎ ছিল না। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর তাঁদের লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

বাজারের কয়েক দোকানদার বলেন, দুজনই ভালো লোক ছিলেন। কারও সঙ্গে কখনো কোনো ঝামেলায় জড়াতে দেখা যায়নি। তাঁদের কাউকে কোনো ধরনের নেশা করতে দেখেননি তাঁরা। সব সময় হাসিমুখে কথা বলতেন।

ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক ফখরুল ইসলাম বলেন, দুই আনসার সদস্যের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। মুখে ফেনা থাকার কারণে সবাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। আনসার সদস্যদের বলা ছিল, যেকোনো সমস্যায় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ফোন করে জানাতে। তারা অসুস্থ বোধ করছেন, এ খবরও কিন্তু তাঁদের কেউ ফোন দিয়ে জানাননি। এর কারণে মনে হচ্ছে, প্রায় একই সময়ে হয়তো তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

জানতে চাইলে নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, ব্যাংক কার্যালয়ের ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই আনসার সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনক। এই ঘটনায় রায়পুরা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে রেখে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্ত একটি নির্দিষ্ট দিকে ধাবিত হবে। দ্রুততম সময়ে দুই আনসার সদস্যের মৃত্যুরহস্য উদ্‌ঘাটনের আশা করছেন তিনি।