বিজয় দিবসে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক আয়োজন

55

বিজয়ের মাসে নগরে চলছে নানা আয়োজন। গান, আবৃত্তি, নাটক, প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুক্রবার মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিনটি উদযাপন করবে দেশ। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সচেতন করতেই এসব আয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিজয় দিবসে নগরে থাকছে কী আয়োজন? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।

ঢাবি খেলার মাঠে ছায়ানটের ‘দেশগান’

করোনাভাইরাস মহামারী কাটিয়ে আবারও বিজয় দিবসে ‘দেশগান’ গাইবার আয়োজন করতে যাচ্ছে ছায়ানট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে হবে এই আয়োজন। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল পৌনে ৪টায় শুরু হবে মূল আয়োজন।

মিলিত কণ্ঠে দেশের গান গাইতে আগত সর্বসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের দোয়েল চত্বর সংলগ্ন সুইমিং পুল গেট। সাংবাদিক, আয়োজক, শিল্পী ও তাদের সঙ্গী মাঠে প্রবেশ করবেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন জিমনেশিয়ামের ফটক দিয়ে।

এবারের অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে নৃত্যসহ ৯টি সম্মেলক গান, দুটি একক গান (বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে) এবং দুটি পাঠ নিয়ে। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘ছবি’ কবিতা আবৃত্তি করবেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, একক গান গাইবেন নাসিমা শাহিন ফ্যান্সি ও সুমন মজুমদার।

‘দেশগান’গুলো বেছে নেওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, গোবিন্দ হালদার, আবদুল লতিফ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, মোহাম্মদ মোশাদ আলী, মীরা দেববর্মণ ও শাহ আবদুল করিমের রচনা থেকে।

নৃত্য পরিবেশিত হবে ‘আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, ‘এখন আর দেরি নয়’, ‘চল্ চল্ চল্’, ‘সঙ্ঘ শরণ তীর্থযাত্রা’, ‘বাংলার হিন্দু বাংলার বৌদ্ধ বাংলার খ্রিস্টান বাংলার মুসলমান’, ‘সামাল সামাল সামাল ওরে সামলে তরী বাইয়ো’, ‘বলো বলো রে বলো সবে বলো রে বাঙ্গালির জয়’, ‘আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই’, ‘লাখো লাখো শহীদের রক্তমাখা’ সম্মেলক গানের সঙ্গে।

এই আয়োজন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেছিলেন, “ভেদাভেদ দূরে ঠেলে, জাতীয় পতাকার লাল-সবুজে দেহ ও মন রাঙিয়ে, সর্বান্তকরণে সকলকে ষোল আনা বাঙালি হয়ে উঠবার ব্রত গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে ছায়ানট।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব

‘স্পর্ধায় তাড়াব ধেয়ে আসা কালো’ স্লোগান নিয়ে রাজধানীর নয়টি মঞ্চে ‘বিজয় উৎসব ২০২২’ আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিজয় উৎসব উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকজয়ী অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার।

ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ১৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, মিরপুর ৬ নম্বর মুকুল ফৌজ মাঠে ১৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, দনিয়া মাসুদ মঞ্চে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কে ১৯ থেকে ২০ ডিসেম্বর, মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনি মাঠে ১৬ ডিসেম্বর, উত্তরা বঙ্গবন্ধু মুক্তমঞ্চে ১৫ ডিসেম্বর এবং পূর্বাচল জয় বাংলা স্কয়ারে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় উৎসবের অনুষ্ঠান চলবে।

১৫০টির বেশি সংগঠনের সাড়ে ৩ হাজারের বেশি শিল্পী এবারের বিজয় উৎসবে অংশ নেবেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগিতায় বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন, ১৭ ডিসেম্বর বেনাপোল ও যশোর এবং ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার গুলশানে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন পার্কে বিজয় উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।

সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহ্কাম উল্লাহ্ বলেন, “একাত্তরের ঘাতক-দালাল, পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারী, ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকারী এবং ২১ অগাস্ট শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলাকারী- একই বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি। তাদের সাথে কোনো আপস করা চলবে না।”

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিজয় উৎসব

আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চলছে আট দিনব্যাপী বিজয় উৎসব। গত ৯ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই উৎসব শেষ হবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে। শুক্রবার বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তন এবং মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে অনুষ্ঠিত হবে উৎসবের অনুষ্ঠানমালা।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সকাল ১০টায় জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে। জাদুঘর মিলনায়তন এবং মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে দিনব্যাপী চলবে সাংস্কৃতিক আয়োজন।

জাদুঘর মিলনায়তনে ‘শিশু-কিশোর আনন্দানুষ্ঠান’ শীর্ষক আয়োজনে অংশ নেবে সোসাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেন, কল্পরেখা, এসওএস শিশুপল্লী, বধ্যভূমির সন্তানদল, খেলাঘর, ইউসেপ বাংলাদেশ ও হাজারীবাগ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ৬টায় বাউল গান পরিবেশন করবেন কুষ্টিয়ার লালন আখড়া ‘আরশীনগর’।

বিকাল ৪টায় মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে স্মৃতিচারণ করবেন জল্লাদখানায় শহিদের সন্তানেরা। এরপর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেবে চারুলতা একাডেমি,স্বপ্নবীণা শিল্পকলা বিদ্যালয়, ঢাকা সিটি স্কুল, বধ্যভূমির সন্তানদল, যুব বান্ধব কেন্দ্র, মিথস্ক্রিয়া আবৃত্তি পরিসর, সংগীত সমাজ কল্যাণপুর, সৌখিন একাডেমি, পঞ্চায়েত শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ও থিয়েটার গেরিলা।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি গবেষক মফিদুল হক বলেন, “বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল, পঁচাত্তের পর সেই ইতিহাসকে বিকৃত করার নানা রকম চেষ্টা হয়েছে৷ তবে সেই ইতিহাসকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সচেতন হতে হবে।”

বিজয় দিবসে নাটক পাড়া

এবারও বিজয় দিবসে মঞ্চস্থ হবে নাট্যদল ‘থিয়েটার’ প্রযোজিত আলোচিত নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। নাটক সরণির মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে বিজয় দিবসে নাটকটির বিশেষ প্রদর্শনী হবে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। পরবর্তীতে নাটকটির নবরূপায়ণ করেছেন সুদীপ চক্রবর্তী।

থিয়েটার এর পরিচালক (সাংগঠনিক) রামেন্দু মজুমদার বলেন, “আমরা চেষ্টা করি প্রতি বছরই বিজয় দিবসে এই নাটকটির প্রদর্শনী করতে। এবারও বিজয় দিবসে নাটকটির মঞ্চায়ন হবে। সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই।”

বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় ম্যাড থেটারের তৃতীয় প্রযোজনা ‘অ্যানা ফ্রাঙ্ক’ নাটকটি জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হবে। অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী থেকে নাট্যরূপ দিয়েছেন আসাদুল ইসলাম এবং নির্দেশনা দিয়েছেন কাজী আনিসুল হক বরুণ। ‘অ্যানা ফ্রাঙ্ক’ নাটকটি আর্য মেঘদূতের একক অভিনয়।

গ্যালারি চিত্রকে প্রদর্শনী

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শতাধিক শিল্পকর্ম নিয়ে ঢাকার চিত্রক গ্যালারিতে চলছে বিশেষ প্রদর্শনী ‘সংগ্রাম’। ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশকে তার আঁকা শিল্পকর্ম নিয়ে এ প্রদর্শনী। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এ প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “শিল্পাচার্যের ১০০টিরও অধিক শিল্পকর্ম, অঙ্কন সামগ্রী ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র রয়েছে প্রদর্শনীতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রাম বিষয়ে জয়নুলের আঁকা উল্লেখযোগ্য কিছু চিত্রকর্ম প্রথমবারের মত এ প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা, মনপুরা ‘৭০, প্যালেস্টাইনি মুক্তি, সংগ্রামসহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মানবিক সংগ্রাম উঠে এসেছে জয়নুলের এই সব শিল্পকর্মে।”

এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের আয়োজনে একাডেমিক ভবনের নিচতলার অস্থায়ী গ্যালারিতে আলোকচিত্র, ডকুমেন্টেশন ও স্থাপনা শিল্প প্রদর্শনী হচ্ছে। পুরো ডিসেম্বর মাস এ প্রদর্শনী চলবে। ১৪ ডিসেম্বর প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নূজহাত চৌধুরী।

চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রশীদ আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের ইতিহাস সচেতন করতেই নানা আয়োজনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা হচ্ছে।

বাংলা একাডেমিতে ‘বিজয়মেলা

বিজয় দিবসে বাংলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে ‘বিজয় মেলা ২০২২’। বৃহস্পতিবার মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। ১৫-১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন দিন চলবে এই মেলা। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ প্রাঙ্গণে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মেলা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব মো. আবুল মনসুর। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির সচিব এ এইচ এম লোকমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী খালিদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে বিজয়মেলার মতো আয়োজন বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।”

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, “বিজয় দিবস শুধু ডিসেম্বর মাসের একটি দিন নয় বরং বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র অভ্যুদয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নেতৃত্বে আমরা যে বিজয় অর্জন করেছি তার সুফল দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে যার যার অবস্থান থেকে সবাইকে কাজ করতে হবে। বাংলা একাডেমি বিজয়মেলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিজয়ের মূল প্রত্যয়কে সকলের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছে।”