পুলিশ-র‌্যাবের পরিচয়ে প্রতারণা, ১০ মাসে গ্রেপ্তার ৩৫০

30

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে র‌্যাব ও পুলিশ পরিচয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগে সোহান শিকদার (২৪) নামে এক যুবককে ২৮ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের সময় তার পরনে পুলিশের ট্রাকস্যুট, রিফ্লেক্টিং ভেস্ট ছিল।

এর আগে ১৫ অক্টোবর মাসুম কবির নামে আরও একজনকে যাত্রাবাড়ী ট্রাফিক জোনে কর্মরত সার্জেন্ট মো. আল মামুন আটক করেন। ২৫ অক্টোবর আদাবরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন আসিফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি। এসময় তার কাছ থেকে একটি খেলনা পিস্তল, ওয়াকিটকি ও একটি পুলিশের ক্যাপ জব্দ করা হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাব-২ এর সহকারী পরিচালক এএসপি শিহাব করিম বলেন, সম্প্রতি আমাদের কাছে অভিযোগ আসে মোহাম্মাদপুর এলাকায় ভুয়া পুলিশ সদস্য ও র‌্যাব পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি চলছে। পরে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি।

র‌্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৩০০ ভুয়া র‌্যাব-পুলিশ গ্রেপ্তার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে র‌্যাব, পুলিশ, এনএসআই ও বিজিবির পরিচয় দিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রায় ২ হাজারের মতো লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালেই এ চক্রের ৩০০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ডিবি পুলিশ বলছে, এই চক্রের সদস্যরা কখনো পুলিশ, কখনো র‌্যাবের পোশাকে ছদ্মবেশ ধারণ করে। আর সঙ্গে থাকে আগ্নেয়াস্ত্র।

চলতি বছরের ২০ অক্টোবর রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ ডিবি পুলিশ পরিচয়দানকারী ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে কাফরুল থানা পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. তানভীর, মো. সাজিদ আহমেদ রাসেল, মো. আফসার হোসেন বাবু ও এনজেল স্যামুয়েল কস্তা। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি খাকি রংয়ের ডিবি লেখা জ্যাকেট, একটি হ্যান্ডক্যাপ, একটি ওয়াকিটকি, একটি চাকু, একটি চাপাতি ও ৪টি বাটন মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিলেন তারা। পরে তাদের নজরদারিতে রেখে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, তাদের ধরার পর ডিএমপির সদর দপ্তর থেকে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয় ভুয়া র‌্যাব-পুলিশ গ্রেপ্তারের অভিযান চলমান রাখতে। এরপর থেকে আমাদের থানা পুলিশ এসব অপরাধ দমনে কাজ করছে।

ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, তাদের নামে বিভিন্ন থানায় আগের বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বাবুর নামে যাত্রাবাড়ী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি, অস্ত্র ও মাদকের তিনটি মামলাসহ কুমিল্লার বুড়িচং থানায় ডাকাতির একটি মামলা ও স্যামুয়েল কস্তার নামে মিরপুর মডেল থানায় মানবপাচারের একটি মামলা রয়েছে।

এর আগেও চলতি বছরের মে মাসে মোহাম্মদপুর থেকে পুলিশের অভিযানে মো. রানা নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার করা হয় এবং পুলিশের কার্ড পাওয়া যায়।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই চক্রের বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

র‌্যাব-পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনায় ডিএমপির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফারুকুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ সময় দেখা গেছে যারা বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি করেছে এবং চাকরিচ্যুত হয়েছে তারাই বেশির ভাগ সময় এসব অপরাধে যুক্ত। পুলিশ পরিচয় দেওয়া মো. সোহেল রানার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আমি বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি, সব কিছু ডিএমপি সদর দপ্তরে জমা দিয়েছি। এরপর থেকে আমাদের উপরের কর্মকর্তা ভুয়া র‌্যাব পুলিশ গ্রেপ্তারের অভিযান পরিচালনা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

গত ৬ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিজিবি সদস্য পরিচয় দেওয়া মোহম্মাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে জানা যায় তিনি কোনো বাহিনীর সদস্য নয়। ৫ বছরে বিজিবির সদস্য পরিচয়ে বেশ কয়েকজন প্রতারক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, যদি বিজিবির কোনো সদস্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিজিবির পরিচয়টা তো বড় পরিচয়। তা ছাড়া কোনো বিজিবি সদস্য যদি ভুয়া র‌্যাব বা পুলিশের পরিচয় দেয় তাহলে এটা প্রমাণিত হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। কিছু কিছু হয়তো বিছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রযুক্তির যুগে প্রতারকরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে বেশি সুবিধা করতে পারে না।

এসব বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মপদ্ধতি অনুকরণ করে পুলিশ-র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে আড়ালে গড়ে তুলছে ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণকারী চক্র। অপরাধীদের পরনে কখনো গোয়েন্দা পুলিশ, কখনো র‌্যাবের পোশাক থাকে। সঙ্গে থাকে আগ্নেয়াস্ত্র। তারা গাড়িতে ব্যবহার করছে বিভিন্ন বাহিনীর লোগো। তাই সাধারণের পক্ষে আসল-নকল চেনা মুশকিল।

এসব অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাদ দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, সাধারণত এসব প্রতারকরা দুইভাবে কাজ করে। একদল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে কথিত অভিযানের নামে নিশানায় থাকা ব্যক্তিকে গাড়িতে তুলে মারধর করে অর্থকড়ি ছিনিয়ে নেয়। আরেকদল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেজে নিয়োগ, বদলি, তদবিরের নামে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।

পুলিশ-র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে অপরাধের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ডিআইজি হারুন অর রশিদ বলেন, এসব বিষয়ে আমরা সাধারণ মানুষকে অনেকবার সর্তক করেছি। তাদের আমরা বলেছি কাউকে সন্দেহ হলে আপনারা স্থানীয় থানা পুলিশকে জানান। তা ছাড়া এসব অপরাধ দমনের জন্য আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সমন্বয় করে কাজ করছি।

তিনি আরও বলেন, এসব অপরাধ দমনে আমরা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করছি এবং আমাদের থানা পুলিশ ও গোয়েন্দারা পুলিশ ও র‌্যাব পরিচয় দেওয়া প্রতারকদের ধরতে তৎপর।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. মনজুর রহমান বলেন, পুলিশ-র‌্যাবের পরিচয়ে প্রতারণার বিষয়টি আসলেই বেশ আগে থেকেই রয়েছে। এরা ধরা পড়ার পর জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে যুক্ত হয়। এদের ধরতে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ নিয়ে আমাদের পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।