কেরানীগঞ্জে অভিনব উপশহর গড়তে চায় রাজউক

27

ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ের পাশে কেরানীগঞ্জে অভিনব এক প্রকল্প নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এখানে আবাসিক প্লটের পাশাপাশি থাকবে বাণিজ্যিক ও শিল্প প্লটও। আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে এখানে। তবে তিন বা পাঁচ কাঠার কোনো ছোট প্লট থাকবে না। এটা হবে উপশহর বা স্যাটেলাইট টাউন। এ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি পাওয়ায় এখন দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে চায় রাজউক।

এরই মধ্যে ওই এলাকার জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। প্রকল্প নিয়ে কারও কাছ থেকে জোরালো প্রতিবাদ আসেনি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াটার ফ্রন্ট স্মার্ট সিটি’ প্রকল্প। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ঢাকায় মানুষের চাপ আরও বাড়বে। তাই অন্যান্য বিভাগ বা জেলা শহরে তা বাস্তবায়ন করা উচিত।

এর আগে কেরানীগঞ্জে ২০১৭ সালে ১৬টি মৌজার সাড়ে ৩ হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে ‘কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল রাজউক। স্থানীয় জনগণের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি রাজউক।

নতুন প্রকল্প সম্পর্কে রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, এ প্রকল্পটি হবে ভিন্ন ধরনের। কেবল আবাসিক প্লটই নয়, মানুষের যাতে কর্মসংস্থান হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্র্রসারণ ঘটে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে- এ রকম অনেক বিষয় মাথায় রাখা হয়েছে। প্রতিটি আবাসিক প্লটের আকার হবে অন্তত এক বিঘা। শিগগিরই প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, এখানে একজনকে একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে না। সর্বনিম্ন পাঁচজন মিলে একটি প্লটের আবেদন করতে পারবেন। ১০ জনও একটি প্লটের আবেদন করতে পারবেন। আর সর্বোচ্চ প্লটের আকার হবে তিন একর। কনডোমিনিয়াম সিটিও থাকবে। বাণিজ্যিক ও শিল্প প্লটগুলো নিলামে বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ বা ব্যবসায়ী সম্প্র্রদায় ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে। সেখানে দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা মাথায় রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু চালুর ফলে ওই এলাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ওই এলাকায় যাতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ না হয়, সে লক্ষ্যেই এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা হয়েছে।

অবশ্য এ প্রকল্প প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই প্রকল্পের একটি কনসালট্যান্সি মিটিংয়ে আমি ছিলাম। সেখানে বলেছিলাম রাজউক পূর্বাচল-ঝিলমিল প্রকল্প এতদিনেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এমন আরেকটি প্রকল্প নিলে সেটা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমরা বরাবরই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে আসছি। সে জন্য খুলনা-রাজশাহীর মতো বিভাগ বা বড় জেলাগুলোতে সরকার স্মার্ট সিটির উদ্যোগ নিতে পারে। সেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। ঢাকার পাশে আরেকটি এ রকম প্রকল্প নিয়ে ঢাকা শহরকে আরও ভারাক্রান্ত করা ঠিক হবে না। বরং কীভাবে রাজধানীর আশপাশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রতিরোধ করা যায় সে জন্য রাজউককে ব্যবস্থা করতে হবে।’

ওয়াটার ফ্রন্ট স্মার্ট সিটি প্রকল্পের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঢাকা-মাওয়া সড়কের কেরানীগঞ্জের শেষ প্রান্তে ধলেশ্বরী নদীর আগেই বাস্তা ইউনিয়ন। সেখানকার ৪ হাজার ৭৭৬ একর জমিকে এ প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ওই জমির বেশিরভাগ স্থানেই কোনো জনবসতি নেই। কোথাও জলাশয় বা কোথাও কৃষিজমি। আর বিভিন্ন স্থানে হরেক ধরনের আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগানো।

এ প্রকল্পে ২ হাজার ৬৫ একর রাখা হবে আবাসিক এলাকা। ১৮৩ একর ব্যবহার হবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে। ৪৮৭ একরে হবে শিল্পায়ন। নাগরিক সুবিধার জন্য থাকবে ৪৪৭ একর। বিনোদনের জন্য ৬৯ একর। সড়ক নেটওয়ার্কের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৬৮০ একর। পার্ক ও সবুজ এলাকা থাকবে ৬০০ একর। জলাধার থাকবে প্রায় ২৪৫ একরে। বিদ্যমান জলাধার রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হবে।

প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজউকের কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পে কিছু ওয়্যারহাউস বা গুদাম থাকবে। বিদেশি ক্রেতাদের জন্য গার্মেন্ট পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রদর্শনী কেন্দ্র থাকবে। পুরান ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী গ্রুপ যেমন মসলা ব্যবসায়ী, কাপড় ব্যবসায়ীদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। অ্যাপল-স্যামসাংয়ের মতো নামিদামি ইলেক্ট্রনিক পণ্য প্রস্তুতকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানকেও প্লট দেওয়া হবে। একটি বড় এলাকা নিয়ে থাকবে আইসিটি কমপ্লেক্স। আবাসিক প্লটগুলো হবে ব্লকভিত্তিক। এ কারণে প্লটগুলোর আকার বড় রাখা হয়েছে। একটি প্লটেই একটি বড় জনগোষ্ঠী বসবাস করতে পারবে।

রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, এতদিন তিন কাঠা-পাঁচ কাঠার প্লট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। উন্নত দেশেও কোথাও তিন কাঠার প্লট তৈরি করা হয় না। এ জন্য পুরোনো পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়েছে। নতুন প্রকল্পে এমনভাবে প্লটের বিন্যাস করা হয়েছে যাতে মানুষ যেখানে বসবাস করবে সেখানেই তাদের কর্মসংস্থান হবে। সেখানেই তারা শিক্ষা লাভ করবে। এটি হলো একটি আদর্শ স্যাটেলাইট টাউন। এখনই ওই এলাকায় স্যাটেলাইট টাউন না করলে ওই এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যতে আর সাজানো যাবে না। কারণ, ওই এলাকায় এরই মধ্যে দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ শুরু হয়েছে। সেটা রোধ করতে হবে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, ওই এলাকায় কিছু আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অল্প স্বল্প জমি কিনে সাইনবোর্ড টানিয়ে জলাশয় ভরাট শুরু করেছে। ওইসব জমি রাজউক অধিগ্রহণ করবে। বাজারমূল্যের চেয়ে তিন গুণ বেশি মূল্য তারাও পাবে। অন্য ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদেরও প্লট দেওয়া হবে। কাজেই কারওই কোনো আপত্তি থাকবে না। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোও এ প্রকল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য।