আশুলিয়ার কলেজ শিক্ষক মিন্টু চন্দ্র বর্মন অর্থিক দ্বন্দ্ব খুন হয়েছেন

273

 

স্টাফ রিপোর্টার : দেড় বছর আগে আশুলিয়ার কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে মাটি খুঁড়ে অধ্যক্ষ মিন্টু চন্দ্র বর্মনের দেহের পাঁচ খণ্ড মাটি চাপা দেয়া অবস্থায় কলেজ মাঠ থেকে এবং আশকোনার একটি ডোবা থেকে তার মাথা উদ্ধার করা হয়। সেই মামলা তদন্ত শেষে র‌্যাবের অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, কলেজ পরিচালনার লাভের ভাগ নিয়ে বিরোধ এবং প্রাইভেট টিউশনে সাফল্যের কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে কলেজ অধ্যক্ষ মিন্টু চন্দ্র বর্মনকে হত্যা করা হয়।

ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার মুখ্য বিচারিক আদালতে তিনজনকে আসামি করে এ অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-৪ এর কর্মরত উপপরিদর্শক মো. রাশেদুল ইসলাম। আজ রোববার বিষয়টি জানা যায়।

মিন্টু চন্দ্র বর্মন ছিলেন আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। ২০২১ সালের ১৩ জুলাই আশুলিয়ার জামগড়া সংলগ্ন বেরন এলাকার রূপায়ন মাঠে নিজের বাসা থেকে নিখোঁজ হন মিন্টু চন্দ্র বর্মণ। কোথাও তার খোঁজ না পেয়ে ছোট ভাই দীপক চন্দ্র বর্মণ ঐ বছরের ২২ জুলাই আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করলে র‌্যাব তদন্ত শুরু করে। পরে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ৯ অগাস্ট রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ প্রঙ্গণের মাটি খুঁড়ে ৩৬ বছর বয়সী মিন্টুর দেহের পাঁচটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়। আর রাজধানীর আশকোনার একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয় তার খণ্ডিত মাথা।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিন আসামি এবং ভিকটিম-এই চারজনের মালিকানায় পরিচালিত হত রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলেজ পরিচালনার লভ্যাংশ বণ্টন, প্রাইভেট পড়ানোকে কেন্দ্র করে পেশাগতভাবে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে মিন্টুকে হত্যা করেন আসামিরা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. রাশেদুল ইসলাম দুই শিক্ষকসহ ৩ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেন। অভিযোগ প্রমাণে চার্জশিটে ৪৬ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো রবিউল ইসলাম রবি, রহিম বাদশা ও আবু মোতালেব।


অভিযোগপত্রে বলা হয়, মোতালেবের ইন্ধনে আসামি রবি ও বাদশা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ, আসামিদের জবানবন্দি ও লাশের ময়নাতদন্তের পর্যালোচনা অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ৩০২/২০১/৩৪ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

টাকা দিয়ে মোতালেব বলেন, যা করার করেন: ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সাভার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি চালু হলে মিন্টু চন্দ্র বর্মণ অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের লাভের অংশ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মোতালেব ও রবিউল মিলে মিন্টু চন্দ্র বর্মণকে সরানোর পরিকল্পনা করে। আবু মোতালেব ঈদুল আজহা পালনের জন্য বাড়ি যাওয়ার আগে রবিউলকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বলে, ‘আমি ঈদের জন্য বাড়ি যাচ্ছি, আমি বাড়ি থাকতে যা করার করেন।’

হত্যা মিশনে রহিম ও রবি: ২০২১ সালের ১৩ জুলাই রাতে রবি ও রহিম বাদশা তাকে হাতুড়ি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে স্কুলের শহীদ মিনারের পাশে গর্ত করে দুই হাত, দুই পা এবং শরীরের মোট ৫টি টুকরো রাতের অন্ধকারে মাটিচাপা দেয় এবং রাজধানীর দক্ষিণ খান থানাধীন এলাকার একটি কচুরিপানা ও পানিভর্তি ডোবায় খণ্ডিত মাথাটি পলিথিনে ভরে ফেলে দেয়।

আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পর ২০২১ সালের ১০ আগস্ট রবি ও রহিম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হয়। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব হাসান আসামি রবি এবং ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান শিকদার আসামি বাদশার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ওই দিন অন্য আসামি আবু মোতালেবের সাত রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। বর্তমানে আসামিরা কারাগারে।

মামলার বাদী দীপক চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘দ্রুত বিচার শেষ করে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আমাদের চাওয়া জড়িত সবার ফাঁসি হোক।’
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাদশা হাতুড়ি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলে অধ্যক্ষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন রবিউল দা দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করেন এবং দেহ ছয়টি অংশে বিচ্ছিন্ন করেন। শরীরের অংশগুলো তারা কলেজ বাউন্ডারির ভেতরে মাটি চাপা দেন। হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র পাশেই একটি স্থানে বালুচাপা দিয়ে শাবল পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফেলে দেন তারা।

পরে মিন্টুর জামাকাপড় এবং মাথা প্যাকেট করে একটি ব্যাগে নিয়ে আশকোনায় একটি ডোবায় ফেলে দেন আসামিরা। আশকোনার একটি রাস্তার পাশে ফেলে দেন হাতুড়ির ব্যাগ। এছাড়া মিন্টুর মোবাইলটি ভেঙে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় ফেলে দেন। পরে তারা আত্মগোপনে চলে যান।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কোর্ট পরিদর্শক মতিউর রহমান বলেন, অধ্যক্ষ মিন্টু চন্দ্র বর্মণ হত্যা মামলায় ৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে র‌্যাব। অভিযোগপত্রটি এখনো যাচাই বাছাই করে বিচারে পাঠানো হয়নি। আগামী ২৯ ডিসেম্বর বাদীর উপস্থিতিতে চার্জশিটের বিষয়ে শুনানি হবে।

নিহত মিন্টু চন্দ্র বর্মণ আশুলিয়ার জামগড়া ছয়তলা এলাকার সাভার রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও পার্টনারে মালিক ছিলেন। তিনি লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের বাড়াইপাড়া গ্রামের শরত বর্মণের ছেলে।